মা। এক অক্ষরের একটি শব্দ। অভিধানের শ্রেষ্ঠতম শব্দ। শব্দটি ছোট। অর্থে অনন্য। শ্রুতিতে মধুময়। মা শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মায়াবী সুন্দর এক মুখ। যে মুখ সারাক্ষণই আদর-ভালোবাসায় ভরা। পৃথিবীর সব মানুষের হূদয়েই রয়েছে মায়ের জন্য অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। মা এমনই একজন যিনি সারাজীবন নিজের সন্তানকে বুকের মাঝে আগলে রাখেন। নিজের সবটুকু দিয়ে চান সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে।
সবচেয়ে প্রিয় শব্দ মা। ২০০৫ সালে একশোরও বেশি দেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সমীক্ষায় ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষের মতামতের উপর ভিত্তি করে সর্বাধিক পছন্দের ৭০টি শব্দের তালিকা করা হয় তারও ‘টপ টেন’ তৈরি করা হয়েছে। এই টপ টেনের ‘টপ’ শব্দটি হলো ‘মা’। তালিকার ভেতর খোঁজাখুঁজি করলেও ‘ফাদার’ শব্দটি কোথাও পাওয়া যাবে না। তালিকায় ড্রিম, লাভ, লিবার্টি, ফ্রিডমের মতো অনেক শব্দ থাকলেও ‘মা’ শব্দটিই শুধু মানবিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ উদাহরণ। কিছুদিন আগে সুনামির ভয়ঙ্কর পানি যখন সমুদ্র উপকূলে তেড়ে আসছিল, যে সময় প্রাণভয়ে যখন দিগিবদিক সবাই ছুটছে, তখনো দেখা গেছে একমাত্র ‘মা’-ই নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও প্রাণহন্তারক পানির দিকেই ছুটে গেছেন সন্তান বাঁচাতে—এই তো মা।
হাজার বছর ধরে মায়ের গন্ধটাই শান্তির, বড় আশ্রয়ের। ‘মা’ উচ্চারিত শব্দের মধ্যে পুরো পৃথিবীটাকে পাওয়া যায়। যেখানে সবুজ শস্যখেত, ঘন অরণ্য গাছ-মাটি সব মেলে। এ সবেরই মধ্যে রয়েছে প্রাণ। মা-ই প্রাণ। প্রাণ ধারণ করা প্রথম প্রাণ।
জীবনে প্রথম শেখা উচ্চারিত শব্দ ‘মা’। এ পর্যন্ত যতবার মা বলে ডেকেছি, এতবার বোধ করি আরকিছুই ডাকা হয়নি। এতবার শান্তিও মেলেনি। সে কারণেই হয়তো পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী তাঁর শিক্ষার্থীদের, ‘সা’ বলতে কষ্ট হলে ‘মা’ বলে উচ্চারণ অভ্যাসের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, মা থেকেই শেখার শুরু। মায়ের সঙ্গে মাটির একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। মাটির বুকে গাছপালার বেড়ে ওঠা মায়ের পেটে সন্তানের বড় হওয়ার মতো। মাটি উপড়ানো গাছের যে দশা, মা থেকে সরে গেলেও সেই দশা। তাই তো মাকে আঁকড়ে ধরা মানে প্রাণের মধ্যে বসবাস।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রীসভা এবং কংগ্রেসের সদস্যদের অনুরোধে সাদা ফুল পরা একদল প্রতিনিধি ১৯১৩ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিক ‘মা দিবস’ পালনের ঘোষণা দেয়। ১৯১৪ সালের ৮ মে কংগ্রেসের এক যৌথ অনুমোদনের পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা দেন যে প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস হিসেবে পালিত হবে এবং ঐদিন জাতীয় ছুটির আদেশ জারি করেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মধ্যে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ইতালি, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া এবং বেলজিয়াম ২ মে মা দিবস পালন করে আসছে।
আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে মা দিবস পালন করার সংস্কৃতি এখনো শুরু হয়নি। তবে আমাদের দেশে মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা এখনো সতত সঞ্চরণশীল। এখানে এখনো বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে বৃদ্ধনিবাসের সন্ধানে বের হতে হয় না। তবে বাজার অর্থনীতির এই যুগে যৌথ পরিবারে ভাঙনের যে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, আমাদের দেশেও সে ব্যাপারে সতর্ক হওয়া বোধ হয় জরুরি। মা-সন্তানের যে বন্ধন এখনো জোরদার রয়েছে আমাদের সমাজে তাকে অটুট রাখার চেষ্টাই হোক আমাদের মা দিবসের লক্ষ্য।
