‘যাঁরা এক সময় নিয়মিত ফোন করতো তাঁরা এখন একবার খোঁজও নেয় না’

আপডেট : ১১ মে ২০১৯, ২১:২৫

পলি সায়ন্তনী। এক সময়ের দাপুটে কণ্ঠশিল্পী গত প্রায় ২ বছর ধরে গান গাইছেন না। বলা ভালো গান গাইতে পারছেন না তিনি। কারণ দূরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জীবনযুদ্ধে লড়ছেন প্রতিনিয়ত। নিজের আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় এই জটিল রোগের চিকিত্সা ব্যয়ভার বহন করে বর্তমানে সেই অর্থ সঙ্কুলান করাটাও দুরূহ হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য। পলি তাঁর বর্তমান সঙ্কট ও শিল্পী জীবন নিয়ে কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিনের সাথে— 

দীর্ঘদিন ধরে আপনাকে নতুন কোনো খবরে দেখা যায়নি, আপনি এই জটিল রোগে ভুগছেন সেটিও গোপন রেখেছেন কেন?

খবর দিইনি। কারণ শিল্পীদের রোগভোগের কথা শুনলে সবাই খারাপভাবে নেয়। করুণা করতে চায়। পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে ভুলে যায়। আর ক্যান্সার এমন এক রোগ। আল্লাহ যেন কাউকে এমন অসুখ না দেয়। আজ নিরুপায় হয়েই সবাইকে বলতে হচ্ছে। আগে ধরনের লজ্জাবোধ থেকে মানুষকে জানাতে চাইনি যে, আমার ক্যান্সার। এখন জীবন মরণ সমস্যা। কেমোথেরাপি থেকে শুরু করে এত ব্যয়বহুল চিকিত্সার খরচ আজ আমার সামর্থের বাইরে।

 

বর্তমানে আপনার শারীরিক অবস্থা কেমন। শেষ কবে গান করেছিলেন?

শেষ স্টেজ শো করেছিলাম ২০০২ সালে। এরপরই অসুস্থ হয়ে পড়ি। ডাক্তারের চেকআপে আমার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে। শেষ পর্যন্ত মোট ১৬টি কেমোথেরাপি নেওয়া হয়েছে আমার ডানহাতে। এতকিছুর ভেতরে সঙ্গীত জীবনটাকে আঁকড়ে ধরে রাখার শক্তি আমার ছিল না।

টেলিভিশন চ্যানেল বা অন্য গণমাধ্যম কর্মী বা আপনার সহকর্মীরা কী আপনার খোঁজ রেখেছেন?

কী আর বলবো! আমি আমার ব্যক্তিগতভাবে এক ধরনের লজ্জাবোধ থেকে খবর জানাইনি এটা ঠিক, কিন্তু মিডিয়ার অনেকেই জানতো আমার আমার এই অসুখের কথা। যেসব চ্যানেলে লাইভ করেছি। নিয়মিত শো করেছি। বাজেটের কথা চিন্তা করিনি। যাঁরা এক সময় নিয়মিত ফোন করতো সেই তাঁরাই এখন একবার খোঁজও নেয় না। সবই যেন স্বার্থের সম্পর্ক। যখন সময় থাকে তখন তাঁদের তদারকির শেষ থাকে না। কিন্তু যখনই কোনো শিল্পী দুর্বিষহ জীবনের ফাঁদে পড়ে যায় তখন তাঁরা তুচ্ছ মিডিয়ার কাছে। যখন আমাকে দিয়ে তাঁদের ব্যাবসা হতো তখন আমার মূল্য ছিল। এখন অসুস্থ তাই আমাকে দিয়ে তাঁদের কোনো লাভ বা লেনদেন হবে না।

আপনার এই শারীরিক সঙ্কটে কেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন? 

তেমন কাউকেই পাশে পাইনি। যখন অসুস্থ হয়ে পড়ি, সবাই ফোন করে বলেছিল তুমি কোনো টেনশন করো না, আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। কেউ কেউ দেখতে আসবো বলে একবার দেখাও করতে আসেনি। আমার পাশে ছিল আমার বোন ডলি সায়ন্তনী, আমার দুলাভাই আর আমার মেয়ে। আর কাউকেই তো আমার পাশে পেলাম না। আমার কথা হলো শুধু হাসপাতালেই কী মানুষকে দেখতে যায়? কেন আমাকে দেখতে যেতে কেউ ১০ মিনিটের জন্য বাসায় আসতে পারলো না? এসব কষ্টের কথা, সহকর্মীদের এমন আচরণের কথা ভেবেছিলাম কাউকে বলবো না। কিন্তু আমি আজ নিরুপায়। তাই না বলে পারছি না।

আপনার বোন এদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী। আজীবন মিডিয়াতে পরিচিতও ছিলেন ডলির ছোট বোন হিসেবে। ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে এটাকে কেমনভাবে দেখেন?

আমি ভাগ্যবান এমন লক্ষ্মী বড় বোন রয়েছে আমার। আর একই পরিবারে কী একের বেশি শিল্পী হতে পারে না। ভারতে লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে কী কাজ করছেন না। এমন হাজারো নজির রয়েছে। আমি আর আপু ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে গান শিখেছি, মা আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আমার ভাই বাদশা বুলবুল আর আমার দুই বোন পায়ের জুতা পর্যন্ত ক্ষয় হয়ে গিয়েছে গান শিখতে গিয়ে। আর ফেমাস হওয়াটা আমি মনে করি ভাগ্যের ব্যাপার, অনেক অনেক গুণী শিল্পী রয়েছেন আমরা চিনি না, যাদের গুণের প্রকাশ ঘটেনি। সবাই ফেমাস হতে পারে না।

অনেকেই এখন সিকিউরড লাইফের জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছেন। আপনি কেন এখনো দেশে পড়ে রইলেন?

আমার জীবনের যা পাওয়া তা এদেশের মাটি থেকেই। আমি ক্ষুদ্র একজন শিল্পী হয়েও আমাকে বিদেশ টানেনি। এ বিষয়টি আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। এখানেই আমার পরিবার আর সব আপনজন, শেষ নিঃশ্বাসটা যেন নিজ দেশের মাটিতেই ত্যাগ করতে পারি সৃষ্টিকর্তার কাছে এটাই কামনা করি।

আপনার এই সঙ্কটময় সময়ে কী ভাবছেন আগামী নিয়ে?

আমরা আমাদের দেশের মমতাময়ী একজন প্রধানমন্ত্রীকে পেয়েছি। যিনি শিল্পীদের কথা ভীষণভাবে ভাবেন। তার কাছে যেতে চাই। আমি একজন মা। আমি এদেশের একজন শিল্পী হয়ে আমার এই চিকিত্সার ব্যাপারে তাঁর সহযোগিতা কামনা করছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনি আমাকে ফেরাবেন না।

 

সাক্ষাত্কার:নাজমুল হোসেন  ছবি:তন্ময় মীর্জা