বাংলাদেশ ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধে সফল একটি দেশ। গত এক দশকে আমরা ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা ৮৭.৬ শতাংশ কমাইয়া আনিয়াছি। তাহা সত্ত্বেও আমাদের এই ব্যাপারে আত্মতুষ্টিতে ভুগিবার কারণ নাই। কেননা ম্যালেরিয়ার জীবাণু শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলেই নহে, সেইখান হইতে আক্রান্ত মানুষের চলাচলের মাধ্যমে এখন সমতলেও ছড়াইয়া পড়িতেছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক নিঃসন্দেহে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ম্যালেরিয়ার জিন ও মানুষের গতিবিধির উপাত্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার মানচিত্রায়ন’ (ম্যাপিং ইমপোর্টেড ম্যালেরিয়া) নামক এক গবেষণায় দেখা যাইতেছে, ম্যালেরিয়ার বিস্তারের সঙ্গে মানুষের গতিবিধির বিশেষ সম্পর্ক রহিয়াছে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার—এই পাঁচ জেলায় মানুষের চলাচল ও মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া এই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গিয়াছে। সাধারণত কাঠ ও বাঁশ সংগ্রহ করিতে সমতল হইতে অনেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে যান। ইহা ছাড়া যাহারা এই এলাকায় চাকুরির কারণে অবস্থান করেন বা ভ্রমণে যান, তাহারাও অনেক সময় একইভাবে জীবাণু সমতলে আনিতে পারেন। এই গবেষণার মাধ্যমে এখন জানা যাইবে কোন রোগী স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত আর কোন রোগী বাহির হইতে জীবাণু বহন করিয়া আনিয়াছেন। গবেষণাটিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের কয়েকটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের ২৮ জন গবেষক অংশগ্রহণ করিয়াছেন।
আমরা জানি, ম্যালেরিয়া একটি প্রাচীন রোগ। প্রায় পাঁচ লক্ষ বত্সর ধরিয়া মানুষ এই মরণব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া আসিতেছে। প্লাজমোডিয়াম নামের এক ধরনের পরজীবীর সংক্রমণে ম্যালেরিয়ার রোগ হয় যাহার বাহক অ্যানোফিলিস জাতীয় স্ত্রী মশা। জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি ইহার প্রধান উপসর্গ। চিকিত্সাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় এই মরণব্যাধির টিকা আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক যে ব্যবস্থা গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাতে এই রোগের প্রকোপ ও মৃত্যুহার উভয়ই কমিয়াছে। তাহার পরও কতগুলি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষত ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের ১৩টি জেলায় এই রোগের প্রকোপ বেশি যেখানে আন্তঃদেশীয় নাগরিকদের চলাচলের সম্পর্ক রহিয়াছে। তাহাছাড়া সাম্প্রতিককালে মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হইয়া মিয়ানমার হইতে আসা কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গার কারণে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি কিছুটা হইলেও বাধাগ্রস্ত হইতেছে। এইজন্য ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি এড়াইতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন বিভিন্ন বন্দরে আসা পর্যটকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। বর্তমানে পর্যটকদের ভ্রমণের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই রোগের বিস্তার লাভ করিতেছে। ইহার মধ্যে কম্বোডিয়াসহ কোনো কোনো দেশে ম্যালেরিয়ার ঔষধের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়া গিয়াছে। তবে আশার কথা হইল, আলোচ্য গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ঔষধপ্রতিরোধী নূতন আকারের ম্যালেরিয়ার কোনো অস্তিত্ব ধরা পড়ে নাই।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বত্সর ২০ কোটি মানুষ ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হইতেছে এবং চার লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করিতেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজন ম্যালেরিয়া শনাক্ত করিবার কিট, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ঔষধ, কীটনাশক ও মশারি বিতরণ। বিশেষ করিয়া সমতলে যাহাতে এই রোগ ছড়াইতে না পারে এইজন্য ম্যালেরিয়া প্রবণ এলাকা হইতে ফিরিয়া আসিবার পর জ্বর হইলে দ্রুত চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
