লিবিয়ার গণতন্ত্র কোন পথে?

আপডেট : ১১ মে ২০১৯, ২১:৩৩

এশতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে আরব বসন্ত শুরু হলে যে কটি আরব দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভবনা তৈরি হয়েছিল লিবিয়া তাদের অন্যতম। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে ২০১১ সালে তাকে  হত্যা ও গদিচ্যুত করার পর দেশটিতে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার যে প্রেক্ষিত গড়ে উঠেছিল তা কিছু কায়েমী স্বার্থবাদী দেশের কূটচালে ভেঙে খান খান হয়ে যায়। বহুনামে ও বহুধারায় বিভিন্ন গোষ্ঠী গণতন্ত্রের বুনিয়াদ রচনার প্রচেষ্টা চালায়। এ লক্ষ্যে লিবিয়ার প্রান্তিক জনগণ এবং মুক্তিকামী মানুষকে দেশ মাতৃকার গণতন্ত্র ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একনিষ্ঠ দেখা যায়।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গণমানুষের সেই গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ফল লিবিয়াবাসীর ভাগ্যে জোটেনি। বৃহত্ শক্তি ও আন্তর্জাতিক স্বার্থচক্রের বহুমুখী ষড়যন্ত্রের ফলে শেষ পর্যন্ত দেশটিতে জাতিসংঘ সমর্থিত তথাকথিত জাতীয় একতার সরকার (গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকার্ড বা জিএনএ) গঠিত হয়। প্রথমদিকে জিএনএর চারপাশ ঘিরে রেখেছিল বৈশ্বিক কায়েমী শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ। কী ছিল সেই রাষ্ট্রসমূহের উদ্দেশ্য? লিবিয়ার তেল সম্পদের লুণ্ঠনের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে তারা মুখোশ পরিধান করে  গণতন্ত্র রক্ষার নামে জিএনএর আন্তর্জাতিক মিত্র রূপে আবির্ভূত হয়েছিল।

দুর্ভাগ্যবশত নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক মৈত্রী বলয় খুব অল্প সময়ের মধ্যে ছিন্ন-ভিন্ন হতে থাকে। নিজেদের মধ্যকার উদ্দেশ্যগত ভিন্নতার কারণে এবং লিবিয়ার সম্পদ লুণ্ঠনে কৌশলগত পার্থক্যের কারণে অবশেষে লিবিয়ার নবগঠিত জিএনএর প্রতি তাদের সমর্থন শিথিল করতে থাকে। গত ৪ঠা এপ্রিল জিএনএ সরকারের ভিত্তিমূল ত্রিপোলীর উপর লৌহমানব জেনারেল খলিফা হাফতার আক্রমণ শুরু করলে কারো বুঝতে বাকি রইল না যে লিবিয়ার গণতন্ত্রের সংগ্রাম এখন নতুন বাক তৈরি করছে। একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণীয়, ত্রিপোলি আক্রমণের পূর্বেই জেনারেল হাফতার সৌদি আরব সফর করেছিলেন। তার এ সফর আরো স্পষ্ট করে তুলে যে লিবিয়ার জিএনএর সরকার পতনে ইউনাইটেড আরব আমিরাত এবং মিসরও সমানভাবে মদদ দিতে থাকবে। সম্প্রতি হাফতারের মিশর সফর তারই আরেকটি প্রমাণ। মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতির স্বার্থ রক্ষায় বৃহত্ শক্তিগুলো তাদের রাজনীতির সমীকরণ ঠিক রেখে স্ব-স্ব স্বার্থের অনুকূলে লিবিয়ার অস্থিতিশীলতায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতে চেষ্টা করবে, যা লিবিয়ার গণতন্ত্র রচনার ভবিষ্যতকে আরো জটিল এবং অনিশ্চিত করে তুলবে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়াসহ বৈশ্বিক মোড়লরাও একই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ করবে এবং লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বৃহত্শক্তিসমূহের নীতিও তাই শতধা বিভক্ত হবে। জেনারেল হাফতারের আক্রমণের পর ব্রিটেন লিবিয়ার যুদ্ধবন্ধে নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবের খসড়া রচনা করে, যেখানে জেনারেল হাফতারের আক্রমণে লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও হাংগামার জন্য দায়ী করা হয়। রাশিয়া জেনারেল হাফতারের আক্রমণ সমর্থন না করলেও ব্রিটেনের মতো শক্ত শব্দ দিয়ে জেনারেল হাফতারের রাজনৈতিক কার্যাবলীকে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাফতারের ত্রিপোলী আক্রমণের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও তার কোনো কারণ উল্লেখ করেনি।

লিবিয়ার সম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষিতে বৈশ্বিক বৃহত্ শক্তিসমূহের এ ধরনের অবস্থান দেশটির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে আরো বেশি কণ্টকাকীর্ণ করে তুলবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জেনারেল হাফতারের ত্রিপোলি আক্রমণ তো কেবল জিএনএ সরকারের বিরুদ্ধে নয়। এই জিএনএ সরকারের রয়েছে জাতিসংঘের সমর্থন। তার মানে কি এই নয় যে, জিএনএ সরকারের প্রতি জাতিসংঘের সমর্থনও মারাত্মকভাবে নড়বড়ে হয়ে গেছে? অর্থাত্  জিএনএ সরকারের পায়ের তলায় এখন আর মাটি নেই? তাই দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এই সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার। প্রশ্ন হলো, জিএনএ সরকারের বিরুদ্ধে কী কারণে বিশ্বশক্তিসমূহ কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও জেনারেল হাফতারের সাম্প্রতিক কথোপকথনের বিষয়টি উল্লেখ করতে পারি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেনারেল হাফতারের আক্রমণকে তিনটি কারণে সমর্থন দিচ্ছেন। (১) সন্ত্রাস দমন (২) লিবিয়ার তৈল সম্পদ রক্ষা (৩) লিবিয়ার গণতন্ত্র রক্ষা। বৈশ্বিক গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে যে, হোয়াইট হাউসের তথ্য মতে লিবিয়ায় স্থায়ী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে ট্রাম্প ও হাফতার অভিন্ন অন্তর্দৃষ্টি ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক আঞ্চলিক সম্পাদক এ্যালান জনসন মনে করেন যে, এতক্ষণে ওয়াশিংটন আশ্বস্ত হয়েছে যে, জেনারেল হাফতারের নেতৃত্বে লিবিয়ার গণতন্ত্র ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত হবে। উপযুক্ত অবস্থার আলোকে অনুমান করা যায় যে, লিবিয়ার গণতন্ত্র এক পিচ্ছিল পথে হাঁটতে শুরু করেছে। জিএনএ সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক মোড়লদের অনুকম্পায় গড়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত সে সরকার নড়বড়ে হয়ে গেল। এরূপ পরিস্থিতিতে দেশটির গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি; কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতায় মনে হয় না সে উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হবে। বৈশ্বিক বৃহত্ শক্তিগুলোর সঙ্গে জিএনএ সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং সেই দূরত্বের পরিধি নিয়ে তাদের মাঝে বেশ পার্থক্যও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জিএনএ সরকারের অভিযোগ হলো- ফ্রান্স জেনারেল হাফতারের ত্রিপোলি অভিযান সমর্থন করেছে; কিন্তু ফ্রান্স তা অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়া জিএনএ সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

লিবিয়ার গণতন্ত্র নির্মাণে লিবিয়ায় প্রান্তিক জনগণের ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া পাওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। লিবিয়ার রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে একত্রিত করে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধ্যায়ের সূচনা করা যায়।

সে লক্ষ্যে বৈশ্বিক বৃহত্ শক্তিগুলোকে নির্মোহ হতে হবে। জাতিসংঘের ভূমিকাও অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। গাদ্দাফীর পতনের আগে ও পরে লিবিয়ার অসংখ্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছিল। সেই রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলায় গ্রন্থিত করতে হবে। কাজটি অত্যন্ত কঠিন; কিন্তু এছাড়া অন্য কোনো উপায়ও তো খোলা নেই। বাইরের থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক মডেল লিবিয়ায় প্রযোজ্য হবে না। লিবীয় রাজনৈতিক নেতাদেরকে নিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণে বৈশ্বিক বৃহত্ শক্তিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

n লেখক :অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত),

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়