আবু হুরাইরা
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। দেশের প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। এ সংখ্যা ক্রমবর্ধমানহারে বেড়েই চলছে। বাংলাদেশ এখন টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এই বিপুল সংখ্যক বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে কতটুকু টেকসই উন্নয়নের ভূমিকা পালন করবে সেটাই দেখার বিষয়। এই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির একমাত্র সফল উপায় হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু আমাদের দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে রয়েছে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা। আলোচ্য নিবন্ধে টেকসই উন্নয়ন ও নতুন উদ্যোক্তার প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরছি।
যেমন: প্রথমত, নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুঁজি থাকে না। পুঁজি সংগ্রহ করতে গিয়ে উদ্যোক্তার অর্ধেক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যায়। আমাদের ব্যাংকগুলোও এসব সৃষ্টিশীল কাজে অর্থায়ন বা ঋণ প্রদান করতে উত্সাহী নন। বরং তারা জুয়াড়ি, ফটকাবাজি, আতশবাজির মতো অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদেরকে ঋণ প্রদান করতেই বেশি আগ্রহী। ব্যাংকগুলোতে ঋণ পাওয়া নবীন উদ্যোক্তাদের তাই কঠিন হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের জাতিগত একটা সমস্যা আছে তাহলো কেউ উপরের দিকে উঠতে চাইলে বা ভালো কোনো কাজের উদ্যোগ নিলে আমরা তা মেনে নিতে পারি না। বাঙালিদের মধ্যে একজন উপরের দিকে উঠতে চাইলে তাকে দশজন ধরে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে দিতে আমরা সদা তত্পর। সদ্য নবীন উদ্যোক্তাদের এটি একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা। আমরা কাউকে নতুন সৃষ্টিশীল কাজে ইতিবাচক পরামর্শ দেই না। কোনো কাজ শুরুর আগেই আদাজল খেয়ে তার সমালোচনা আর নেতিবাচক মন্তব্য করতে নেমে পড়ি। এই নেতিবাচক মন্তব্য কোনো উত্সাহী উদ্যোক্তাকে নিরুত্সাহিত করে। এভাবে স্বপ্নের কাঙ্ক্ষিত ভাবী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটে। যেখানে শতাধিক বেকারের কর্মসংস্থান করতে পারতো তা আপনার-আমার একটা নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে গোড়াতেই এসপার-ওসপার হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অসহযোগিতা। আমাদের দেশে যখন কোনো কর্মের নতুন উপায় উদ্ভাবন করা হয় তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ে যায়।
চতুর্থত, সকল পেশাকে সমান চোখে না দেখা। আমরা মুখে যতই বুলি আওড়াই না কেন যে প্রত্যেক কর্মকেই শ্রদ্ধা করতে হবে। বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সমাজে এরকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে কেউ বিএ, এমএ পাস করে বড় পদে চাকরি করতেই হবে। নইলে এই প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা মূল্যহীন। এটা ঠিক নয়।
পঞ্চমত, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতি। সমাজে কেউ ব্যতিক্রমী কিছু করবে তা অকল্পনীয়। ধরা যাক, এলাকার চলাচলের রাস্তাটি বন্যায় হঠাত্ করে ভেঙে গেলো। সকল মানুষ চেয়ে থাকে সরকার কেন এর সংস্কার করছে না! আমরা চাইলেই এই রাস্তাটুকু তাত্ক্ষণিক সহযোগিতা দ্বারা রাস্তা বা সেতু নির্মাণ করে জনদুর্ভোগ কমাতে পারি। সাধারণত এরকম উদ্যোগ কেউই নিতে চায় না। যদি কেউ মাথায় আনেন এরকম উদ্যোগ তাহলে তাকে নিয়ে বিস্তর সমালোচনা শুরু হয়ে যায়। কাজটিতে কিভাবে সহযোগিতা করতে পারে এ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নাই। কিন্তু তাকে নিয়ে সমালোচনার অন্ত নেই।
একটি দেশের মোট জনসংখ্যার বিরাট অংশ নিষ্ক্রিয় হলে কি করে সেই জাতি উন্নয়ন করবে! সেটি যদি তরুণ আর শিক্ষিত হয় তাহলে তো জাতির নিশ্চিত ধ্বংস। আমাদের শুধু নিজের জন্য ভাবলে চলবে না। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এই বিরাট বেকার অংশকে কর্মমুখী করা সকলেরই কর্তব্য। এই সমস্যা সমাধানকল্পে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনা জরুরি। একইসঙ্গে আমাদের শিক্ষানীতিতেও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের যাতে কর্মমুখী করে গড়ে তোলা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। শ্রেণিকক্ষে গতানুগতিক ইতিহাস আর বিতর্কিত বিষয়ে চর্চা না করায় ছাত্র-ছাত্রীদেরকে গবেষণা ও উদ্ভাবনী জ্ঞান চর্চা করাতে হবে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলাতে প্রযুক্তি শিক্ষার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে কম্পিউটার শিক্ষাকে সর্বসাধারণের জন্য বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। উপরন্তু, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে। আলোচিত বিষয়াবলীর প্রতি সরকার ও জনগণ সচেতন হলে বেকারত্বের অভিশাপ হতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হলেই জনসংখ্যা জনসম্পদে রূপান্তরিত হবে। সেদিন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাপিয়ে বিশ্বের আদর্শিক রাষ্ট্রে পরিণত হবো।
nলেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
