চিকিত্সা বিজ্ঞানে যতটুকু উন্নতি সাধিত হয়েছে তার অধিকাংশ
হয়েছে একুশ শতকের গোড়ার
দিকে। এর ধারাবাহিকতায় যন্ত্রের সাহায্যে চিকিত্সা ব্যবস্থা বর্তমান সময়ে কল্পনাতীত সুখ্যাতি অর্জন করেছে। হাড় ও জোড়ার সমস্যার চিকিত্সার ক্ষেত্রে অকল্পনীয় উন্নতি হলেও আমাদের দেশে অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে চিকিত্সা সীমিত আকারে শুরু হয়েছে। জোড়ার বিভিন্ন সমস্যার অত্যাধুনিক চিকিত্সা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। হাড় ও জোড়ার চিকিত্সার এক সফল ও কার্যকর সমাধান এনেছে বিস্ময়কর আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারী। এটি হলো অর্থোপেডিক চিকিত্সায় বর্তমান যুগের সর্বশেষ ও সর্বাধুনিক পদ্ধতি। আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারী মূলত মিনি ইনভেসিভ বা কি হোল সার্জারী অর্থাত্ ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা যুক্ত যন্ত্র (স্কোপ) জোড়ায় প্রবেশ করিয়ে এবং যন্ত্রের সাথে যুক্ত বাহিরে টিভি স্ক্রিন বা মনিটর দেখে অপারেশন করা হয়।
আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারীর সুবিধাসমূহ
১. আর্থ্রোস্কোপ একটি সোফিসটিকেটেড যন্ত্র যা জোড়ার চিকিত্সায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ছাড়াও রোগের ডায়াগনোসিসের ক্ষেত্রে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
২. লম্বা করে চামড়া কেটে অপারেশন করতে হয় না। শুধুমাত্র ছোট ছিদ্র দিয়ে আর্থ্রোস্কোপ জোড়ায় প্রবেশ করিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়।
৩. অপারেশনে রক্তক্ষরণ খুব কম হয় বলে ব্লাড ট্রান্সফিউসন (রক্ত দেওয়া) দরকার হয় না।
৪. হাসপাতালে বেশীদিন থাকতে হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনের দিনই রোগী বাড়ী চলে যেতে পারে।
৫. জোড়ার মুভমেন্ট তাড়াতাড়ি শুরু করা যায় এবং রোগী শারীরিকভাবে অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে। শরীরের বিভিন্ন জোড়ার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো কাঁধ, হাঁটু, কনুই, গোড়ালী ও হিপ’র (কটি) জোড়া এবং এদের বিভিন্ন ধরণের সমস্যা অতি সহজেই আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারীর মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।
কাঁধের জোড়ার সমস্যার লক্ষণ
কাঁধে উক্ত ব্যথায় কাত হয়ে ঘুমানো যায় না, হাত সামনে বা পাশে উঠানো যায় না, হাত দিয়ে জামার বোতাম লাগানো, মাথার চুল আঁঁচড়ানো, প্যান্টের পিছনের পকেটে হাত দেওয়া
ও পিঠ চুলকানো যায় না।
কখনও কখনও জোড়া ফুলে যায়, কতিপয় মুভমেন্টে জোড়া ছুটে যাবে এমন মনে হয় এবং অতি সহজেই বার বার জোড়া ছুটে যায়।
চিকিত্সা
১. জোড়া ছুটে যাবে এমন মনে হলে বা অতি সহজেই বার বার জোড়া ছুটে গেলে আর্থ্রোস্কোপিক ব্যাংকার্ট রিপেয়ার করা হয়।
২. কাঁধের মাংশপেশী বা টেনডন টিয়ার হলে বা ছিড়ে গেলে আর্থ্রোস্কোপিক রিপেয়ার করা হয়।
৩. আর্থ্রাইটিস হয়ে হাড় (ওসটিওফাইট বা স্পার) বেড়ে গেলে বা লুজেফ্রগমেন্ট হলে আর্থ্রোস্কোপিক রিমোভ বা বের
করা হয়।
৪. বার্সাইটিস, ক্যালসিফিক টেনডিনাইটিস ও ওসিফাইড লিগামেন্ট হলে আর্থ্রোস্কোপিক ডিকমপ্রেসন করা হয়।
হাঁটুর সমস্যার লক্ষণসমূহ
মাঝে মধ্যে হাঁটু ফুলে আবার স্বাভাবিক হয়। ব্যথা হয় এবং মুভমেন্টে ব্যথা বেড়ে যায়। অনেকক্ষণ হাঁটু ভাঁজ করে
বসার পর হাঁটু সোজা করা
যায় না; এদিক-ওদিক মুভমেন্ট করে হাঁটু সোজা করতে হয়।
হাঁটু সম্পূর্ণ ভাঁজ বা সোজা করা
যায় না। উচুঁ-নিচু জায়গায় হাটলে ইনসিকিউরিটি বা জোড়া ছুটে বা বেঁকে যাবে এমন মনে হয়।
সিঁড়ি দিয়ে উঠা-নামা করতে
এবং বসা থেকে দাঁড়াতে কষ্ট হয়।
চিকিত্সা
১. ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ইনজুরির ক্ষেত্রে নতুন লিগামেন্ট পুন:স্থাপন করা হয়।
২. মেনিসকাস ইনজুরি হলে রিপেয়ার বা সেলাই করা হয়।
ক্ষেত্র বিশেষে সেভিং করা হয়
এবং টুকরা অংশ বের করা হয়।
৩. ওসটিওফাইট, হাড় ও তরুণাস্থিতির আলাদা অংশ, এবং লুজ বডি রিমোভ করা হয়।
৪. সাইনোভিয়াল বায়োপসি ও ওয়াশআউট আর্থ্রোস্কোপি দিয়ে
করা যায়।
কনুই জোড়ার সমস্যার লক্ষণ জোড়ায় ব্যথা হয় এবং কাজ করতে গেলে বেড়ে যায়, জোড়া ফুলে যায়,
চা তৈরী করতে, ভিজা কাপড়
নিংড়াতে, এবং সেক-হ্যান্ড করতে অসুবিধা হয়। কনুই সম্পূর্নভাবে
সোজা বা ভাজ করা যায় না।
চিকিত্সা
১. বার্সাইটিস ও টেনডিনাইটিস হলে ডিকমপ্রেসণ করা হয়।
২. সাইনোভিয়াল বায়োপসি ও ডেব্রাইডমেন্ট করা যায়।
৩. টেনিস ও গলফারস এলবো
হলে ডিকমপ্রেসন ও টেনডন
রি-ইনসারশন করতে হয়।
৪. লুজ ফ্রেগমেন্ট (আলাদা অংশ) বের করা হয়।
গোড়ালি ও হিপ জয়েন্টের সমস্যার লক্ষণসমূহ
ব্যথা হয়, পায়ে ভর দিলে ব্যথা বেড়ে যায় এবং হাটতে ভীষণ কষ্ট হয়। জোড়ার মুভমেন্ট কমে যায়। গোড়ালি ফুলে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠার বা অনেকক্ষণ বিশ্রামের পর দাঁড়াতে ভীষণ কষ্ট হয়।
চিকিত্সা
১. সাইনোভিয়াল বায়োপসি, ডেব্রাইডমেন্ট ও ওয়াশআউট করা যায়।
২. ওসটিওফাইট, হাড় ও তরুণাস্থির আলাদা অংশ, স্পার এবং লুজ বডি রিমোভ করা হয়। জয়েন্টের সমস্যা কনজারভেটিভ বা মেডিকেল চিকিত্সায় ভালো না হলে এবং যে ক্ষেত্রে আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারী প্রথম থেকেই প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ আর্থ্রোস্কোপিক সার্জনের পরামর্শ নেয়াই শ্রেয়। আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারীর পর নিয়মিত এবং উপযুক্ত রিহেবিলিটেশনের মাধ্যমে রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে।
