সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

নারী যেন নির্বাচনের প্রাণ

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৩, ২০:৩০
গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দেশের চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এই নির্বাচনে নারীরা ভোট দিয়েছেন, ভোটাদের সহযোগিতা প্রদানের কাজ করেছেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। আবার নিরপত্তার দায়িত্বও পালন করেছেন অনেক নারী। এই নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন— লিটন বাশার, হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী এবং কেয়া চৌধূরী সিলেট অফিস \ গত ১৫ জুন সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে এ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পেছনে ভূমিকা ছিল প্রার্থী, ভোটারসহ সংস্লিষ্ট সকল মহলের। ইচ্ছে থাকলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয় সব মহলে-তা বুঝি এবারও প্রমাণ হলো এই সিটি নির্বাচনে। এদিকে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন নিরাপত্তা জোরদার করেন। কঠোর নিরাপত্তা আবার ভোটাররা সাবলীলভাবে উপস্থিত হন কেন্দ্রে। তারা ভোট দেন স্বাচ্ছন্দের সাথে। এ ক্ষেত্রে নারী ভোটাররাও ছিলেন একেবারে উদ্বেগহীন। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে নারী সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেছেন যথাযথ ও আন্তরিকভাবে। তাদের কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মত। ‘আজকাল আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নারী সদস্যরা অনেক ভালো করছে’, এমন মন্তব্য করে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার রোকন উদ্দিন বলেন, ‘সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি ছিল বেশ প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ, তাই আমরা প্রথম থেকেই সতর্ক ছিলাম এবং নারী নিরাপত্তাকর্মীরা বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছে।’ তিনি বলেন আমরা তাদের উপর শতভাগ আস্থা রেখেছিলাম, তারা দায়িত্ব পালন করেছে সঠিক ভাবে।’ রোকন উদ্দিন জানান সিলেট সিটি নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবল পর্যায়ের ১৩৫ নারী, আনসার ও ভিডিবির ৩৬৫ জন নারী সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। র্যাব-৯ জানায় তাদের ১০-১৫ জন নারী সদস্য এ নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্বে কাজ করেছে। তিনি আরো জানান তারা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে মহিলা ও বৃদ্ধদেরও সেবা দিয়েছে। নির্বাচনের দিন ২৫টিরও বেশি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায় বৃদ্ধা ভোট দিতে এসেছেন কিন্তু তিনি তীব্র গরম আর ভিড়ের কারণে কক্ষে ঢুকতে পারছেন না-এমন ভোটারদের পরম মমতায় নারী নিরাপত্তা কর্মীরা কক্ষে ঢুকিয়ে দিতে সহায়তা করতে দেখা গেছে। অপরদিকে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পুলিং অফিসার হিসাবে একহাজার থেকে ১২শত নারী দায়িত্বপালন করেছেন এ নির্বাচনে। তাদের কর্মতত্পরতায়ও ভোটাররা যেমনি খুশি, তেমনি নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সব কিছু মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন এবারের সিলেট সিটি নির্বাচনকে ‘মডেল’ বলে আখ্যায়িত করেছে। বরিশাল অফিস \ সংরক্ষিত ২নং ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন জাহানারা বেগম। ৫নং পলাশপুর বস্তির বাসিন্দা জাহানারা বেগম জীবন-যুদ্ধে লড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বস্তিবাসীর জীবনমান পাল্টে দেয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসছেন। ঝালকাঠী সদর উপজেলার জাহানারা বেগমের কত সালে বিয়ে হয়েছে তা মনে নেই। তবে স্বামীর সাথে হাটখোলার সাগর গলিতে ভাড়া থাকতেন। স্বামী মামুন সিকদার লঞ্চঘাটে ইজারাদারের সাথে যুক্ত হয়ে টোল আদায় করতেন। ৩ ছেলে ও ১ কন্যা সন্তানের জননী জাহানারা বেগম ১৯৯২ সালে পলাশপুর বস্তির স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন। মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা ফলের ব্যবসা করে সংসার চালায়। জাহানারা বেগম বস্তির অপর বাসিন্দাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে সময় কাটান। জাহানারা বেগম জানান বস্তির বাসিন্দা হওয়ার পর তার মতো দরিদ্র মানুষের বিপদে-আপদে ছুটে যাওয়ার কারণে সকলের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন। বস্তির কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে সেবা প্রদান, আর্থিক অভাব-অনটনে থাকা পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতার পথ দেখানোই ছিলো তার প্রধান কাজ। বস্তির বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে নারীদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি। সেই থেকে সকলের দৃষ্টিতে নারী নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। এরপর বস্তির রাস্তাঘাট নির্মাণ ও আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে নিরলস ছুটে চলেছেন। এলাকাবাসীর ইচ্ছায় ২০০৩ সালে প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। নির্বাচনী ব্যয় বহন করেছেন বস্তির বাসিন্দারা। গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন আলমতাজ বেগমের কাছে। এবার প্রতিদ্বন্দ্বী পিয়ারা বেগমকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে পুনরায় বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে এনেছেন জাহানারা বেগম। তার সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৪, ৫ এবং ৬নং ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত থাকলেও জাহানারা বেগমের দৃষ্টি বস্তির ৬০ হাজার মানুষের দিকে। তিনি জানান- বস্তিবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই তিনি ১৯৯২ সাল থেকে লড়ে আসছেন। ইতিমধ্যেই বস্তির নাগরিক সুবিধা অনেকাংশে নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে ঐ বস্তিতে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুত্ সুবিধা নিশ্চিত করা, জলাবদ্ধতা নিরসন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠির নতুন প্রজন্মের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়াই তার প্রধান লক্ষ্য। বস্তিবাসীর সাথে আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা এই নারী নেত্রী বস্তির মানুষের সুখ-দুঃখ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি জানান- অন্যের দুঃখ দেখার কিছু নেই। নিজেই এ বস্তির বাসিন্দা। তাই তাদের জীবন আমার জীবনের সাথে একই সুতোয় গাঁথা। তারা শুধু আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেননি। নির্বাচনী খরচ মেটানোসহ সার্বিক সহায়তা দিয়েছে এ বস্তির মানুষ। অপর ওয়ার্ড দু’টির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জাহানারা বেগম বলেন, সর্বত্রই একজন করে পুরুষ ওয়ার্ড কাউন্সিলর রয়েছে। আমার ৩টি ওয়ার্ডের দিকেই দৃষ্টি রয়েছে। আর বস্তিবাসীরা পিছিয়ে থাকায় তাদের নাগরিক সুবিধা অন্য এলাকার চাইতে খুবই কম। তাই তাদের চাহিদা নিশ্চিত করার জন্য একটু বেশি মাত্রা যোগ হওয়া খুবই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন জাহানারা বেগম। বিএম কলেজের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নরত কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন ইসরাত আমান রূপা। সংরক্ষিত ৬নং ওয়ার্ড থেকে ৫ নারী প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। রূপার মা মোরশেদা বেগম কাজল প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ঐ ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরের নির্বাচনে মজিদা বোরহানের কাছে পরাজিত। মায়ের প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনা। রূপার লক্ষ্য নারী সমাজের উন্নয়নের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সেবার ব্রত নিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর এখনো শপথ পড়ে নগর ভবনে যাওয়া হয়নি। তবুও বিশ্রাম নেই। দিন-রাত ভোটার ও সমর্থকদের বাসা-বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এরই ফাঁকে ইত্তেফাকের একান্ত আলাপকালে বলেছেন তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের কথা। মায়ের পরিবর্তে নিজের প্রার্থী হওয়া সম্পর্কে রূপা জানান, বর্তমান যুগে তরুণ নেতৃত্ব ছাড়া নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা বা এলাকার জন্য কাজ করা দুরূহ ব্যাপার। সাধারণ ভোটাররাও তরুণ প্রজন্মের প্রার্থীদের প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আমরা তরুণ প্রজন্ম আগামীর ভবিষ্যত্ গড়তে জনপ্রতিনিধি হিসাবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছি। বিএম কলেজের মাস্টার্স শেষবর্ষের ছাত্রী রূপার ব্যক্তিগত কোনো আয় নেই। ৩ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে রূপা সবার ছোট। বাবা-মায়ের সাথে ব্রাউন কম্পাউন্ডের বাসভবনে বসবাস করেন রূপা। ভবিষ্যত্ জীবন তিনি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান। কেয়া চৌধুরী \ ‘আমার টাকা পয়সা নাই কিন্তুু তার পরেও আমি নিজেরে অসহায় ভাবি-না। আমি জানি, আমি মানুষের মনত আছি, হেন তাইনে আমারে ভোট দিবা, খারণ হক্কলের সুখে-দুখে আমারে লগে ফায়। আর অকটাই আমার সাহস, অকটাই আমার শক্তি-ফুজি।’ ভোট চাওয়ার পাশাপাশি এই কথাগুলোই বলছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সংরক্ষিত ১৯, ২০, ২১ নং ওয়ার্ডে শামীমা স্বাধীন। শামীমার মার্কা ছিল বালতি। নারী ভোটাদের প্রিয় ছিল তার নির্বাচনী প্রতীকটি। সিলেটের ১৯, ২০, ২১ নং ওয়ার্ডে নারী-পুরুষের কাছে শামীমা স্বাধীন আগে থেকেই পরিচিতমুখ। চিনবেই না কেন? প্রবাসী স্বামীর অবহেলায় সংসার ভাঙার পর দুটি কন্যা সন্তান নিয়ে শামীমা অসহায় অবস্থায় থাকলেও টিলাঘর এলাকার অন্যান্য নির্যাতিত নারীদের পাশে তিনি ছিলেন সব-সময়। বিশেষ করে প্রবাসী স্বামীদের দ্বারা বঞ্চিত নিগৃহীত নারী, যারা স্বামীর অবর্তমানে বছরের পর বছর শ্বশুরালয়ে দুঃসহ জীবন অতিবাহিত করেন তাদের দোয়ারে সাহসের প্রতীক হয়ে সর্বদা পাওয়া যায় শামীমা স্বাধীনকে। একজন মানবাধিকার কর্মী হয়ে তিনি গত ৯ বছর যাবত দুস্থ নারীদের এ সহায়তা দিয়ে আসছেন। শুধু কী তাই! যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্ছার রয়েছেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম সিলেট বিভাগের সাথে। আর তাই নির্বাচনের আগে প্রায় প্রতিটি দিনে-রাতে দেখা গেছে তার সহকর্মীদের রোদে-বৃষ্টিতে পুড়তে।