এক সময়ের খরস্রোতা শীতলক্ষ্যা এখন অনেকটা মৃতপ্রায়। নারায়ণগঞ্জকে এক সময় বলা হত প্রাচ্যের ডান্ডি। রেল, ট্রেন, স্টিমার থেকে শুরু করে সবকিছুই শুরু হত নারায়ণগঞ্জ থেকে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের বিরাট ভূমিকা ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুসহ অনেক নামি দামি জ্ঞানীগুণীর আগমনে ধন্য নারায়ণগঞ্জ এখন শ্রীহীন একটি মৃত নগরী বলা চলে। বাঙালি জাতির গর্ব মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথম বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এই নারায়ণগঞ্জবাসী। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই নারায়ণগঞ্জে বসেই আওয়ামী লীগ গঠনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার নারায়ণগঞ্জ এখন শুধু শ্রীহীনই নয় বরং বলা চলে সর্বক্ষেত্রে ঘটেছে অবক্ষয়। অবশ্য, এই অবক্ষয় শুধু নারায়ণগঞ্জে নয়, বলা চলে সমগ্র দেশেই ঘটেছে। রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে এমনকি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও সর্বত্র চলছে বিভাজন। আর এই বিভাজনের কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন চরম অনৈক্য চলছে তেমনি সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা হিসাবে এক সময়ের পরিচিত যাদেরকে বলা হয় জাতির বিবেক সেই জাতির বিবেকরাও এখন ক্ষেত্রবিশেষে নানা মত ও পথে বিভাজনের আষ্টেপিষ্টে বাধা পড়ে গেছে। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে এ কথা স্বীকার করতে আমি লজ্জাবোধ করছি না যে, সাধারণ মানুষের মনের কথা কিংবা যা ঘটছে অথবা যা দেখছি তা হুবহু আমরা লিখতে পারছি না। এটা কেউ স্বীকার করুক বা নাই করুক এর পিছনে বড় বাধা হয়ে কাজ করছে সেই বিভাজন। আমরা সর্বক্ষেত্রে এখন শুধু বিভাজনই দেখতে পাচ্ছি। কেউ উত্তর দিকে গেলে সাথের জন দক্ষিণ দিকে যেতে হবে এটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে স্বার্থগত গোপন ঐক্য থাকলেও কর্মীদের সামনে যখন তারা কথা বলে তখন মনে হয় তার দলেরই আরেকজন যেন তার চরম প্রতিপক্ষ। এই পক্ষপাতিত্বের অপছায়া এখন আমাদের উপরেও অনেকটা ভর করেছে। যে কারণে আমরা ইচ্ছে থাকলেও সত্য কথা বলি না কিংবা মাঠে-ময়দানে সত্য কথা বললেও সেই কথাটি আমরা লিখি না। ক্ষেত্রবিশেষে আমরা যা বিশ্বাস করি না তাই আমরা বিবেক বন্ধক রেখে লিখে চলেছি। অথচ এই অবস্থা হওয়ার কথা নয়। রাজধানীর সবচেয়ে কাছের শহর এই নারায়ণগঞ্জ একটি মডেল সিটি হওয়ার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক হানাহানি, নিজেদের অনৈক্য আর স্বার্থপরতা আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বদলে পিছনের দিকে টেনে চলছে। ৭০ দশকের শেষ দিকে ছাত্র অবস্থায় সাংবাদিকতাকে মহান পেশা মনে করে অন্যকোন পেশায় না গিয়ে এই পেশায় আসি। প্রথম দিকে দুই-তিন বছর ঢাকায় বিভিন্ন পত্রিকায় নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত অনেকটা বিনা পয়সায় কাজ করি। আশির দশকের শুরুতে ইত্তেফাকে যোগ দেই। বলা চলে তখন থেকেই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি। যা এখনো আটকে আছে।১৯৮৯ সালে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে আমরা প্রবাসী সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, বিএফইউজের তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ্ব জহিরুল হক ও তত্কালীন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান শাহরিয়ারকে সম্বর্ধনা প্রদান করি।
এক সময় এখানে সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু তত্কালীন সময়ে অর্থাত্ আশির দশকে সাধারণ মানুষের কাছে সংবাদকর্মীরা ছিল পূজনীয়। কারণ ঐ সময় যারা এই পেশায় আসে তাদের মধ্যে অর্থবিত্তের চাইতে সমাজের জন্য কাজ করা আর অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তখন আমাদের মধ্যে আপোষকামিতা ছিল না বললেই চলে।
নারায়ণগঞ্জে সংবাদপত্রের সংখ্যা বেড়েছে-বেড়েছে সংবাদকর্মীর সংখ্যা। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে ভবনের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে, বেড়েছে সদস্যসংখ্যাও। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে কিংবা সর্বক্ষেত্রে ভর করে থাকা বিভাজনকে দূর করতে আমরা কতটুকু সক্ষম হয়েছি এ প্রশ্ন বার বার নিজের কাছে করেও কোন সদুত্তর পাইনি।
তবে আমাদেরও মধ্যে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে না পারলে আগামী প্রজম্ম আমাদের ক্ষমা করবে কিনা জানি না। পরিশেষে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম শীতলক্ষ্যার পানি যেমন দূষিত হয়ে পড়েছে, তেমনিই আমাদের সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে দূষণ ঢুকে পড়েছে। দূষিত এই সমাজকে বাঁচাতে হলে দূষণমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়তে সবাইকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। আর এক ক্ষেত্রে সংবাদকর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয় স্থল হিসেবে সাংবাদিকদের কাছেই ছুটে আসে। আমরা এমন একটা পেশার সাথে জড়িত, সাধারণ মানুষ যে পেশাকে মনে করে তারা নিরপেক্ষভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। সুতরাং আমাদের কর্মকান্ডে আমরা যেন এ পেশাকে বিতর্কিত করে না তুলি এ ক্ষেত্রে পেশাদার সাংবাদিকদের সচেতন থেকে কাজ করে যাওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে আমরা যদি আমাদের পেশার সাথে কোন প্রকার আপোস করে কোন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর পক্ষে কলম ধরি তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাসের পাতায় আমাদের বিতর্কিত ভূমিকা কালো অধ্যায় হিসাবে লিখিত হবে। এক কথা স্বীকার না করলেও এটাই বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই আমাদের প্রতিটি পেশাদার সংবাদকর্মীকে কাজ করে যেতে হবে।
