পীর আওলিয়ার পুণ্যভূমি সিরাজগঞ্জ

আপডেট : ২৬ জুন ২০১৩, ২০:১৭
ঐতিহ্যবাহী সিরাজগঞ্জ জেলা পীর আওলিয়ার পূণ্যভূমি সিরাজগঞ্জ জেলা। এ জেলায় খাজা শাহ শরীফ জিন্দানী, খাজা শাহ মোহাম্মদ ইউনুস আলী, হযরত শাহ সুফী আফজাল মাহমুদ, শাহ মখদুম, শাহ কামাল সহ অসংখ্য পীর আওলিয়ার আবির্ভাব ঘটেছিল এ জনপদে। নিচে চার প্রধান পীর আওলিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো। হাজী শাহ শরীফ জিন্দানী (রহঃ) বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভারতের আজমীর শরীফে অবস্থিত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর মাজার জিয়ারত করতে যায় মনের আশা পূরণের জন্য। কিন্তু আজমীর শরীফ গামী মানুষের বেশীর ভাগ মানুষই জানে না, খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী যে পীরের অনুসারী ছিলেন, তিনি ছিলেন হযরত শাহ শরীফ জিন্দানীর শিষ্য। একারনে সকলে হযরত শাহ শরীফ জিন্দানী (রঃ) কে খাজা মইনুনিদ্দন চিশতীর দাদাপীর বলেন। শাহ শরীফ জিন্দানী (রঃ) শুয়ে আছেন সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার চলনবিল অঞ্চলের হান্ডিয়াল নঁওগা নামক স্থানের এক নিভৃত পল্লীতে। হযরত শাহ শরীফ পীর জিন্দানী এ অঞ্চলে সুলতাল নাসিরুদ্দিন নসরত্ এর আমলে ( ১৫১৯-১৫৩২ খৃঃ) সালে আগমন করেন এবং তার প্রচারনায় প্রচুর মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। সুলতান নাসিরুদ্দিন নসরত্ যখন বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখন ইরাকের জিন্দান শহর নিবাসী সুফী সাধক জিন্দানী (রঃ) আসেন সুদুর সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার হান্ডিয়াল নঁওগা নামক গ্রামে ইসলাম প্রচার প্রচারের জন্য। এখানে এসে তিনি যেখানে আস্তানা স্থাপন করলেন সেটি ছিল এক মুসলিম বিদ্বেষী ও প্রজা নির্যাতনকারী রাজা ভানু সিংহের এলাকা। তাই তিনি রাজা ভানু সিংহের কোপানলে পড়েন। খাজা শাহ্ মোহাম্মদ ইউনুস আলী এনায়েতপুরী (রহঃ) বিশিষ্ট পীর ও সাধক খাজা মোহাম্মদ ইউনুস আলী জন্ম গ্রহণ করেন ১৮৮৬ সালে বেলকুচি থানার এনায়েতপুরে। তার পিতার নাম শাহ সুফী মৌলানা আবদুল করিম। তিনি এলাকায় খাজা পীর বলেই বেশি পরিচিত ছিলেন। নিজ যোগ্যতায় তিনি পীর সাহেবের চব্বিশ লাখ মুরিদানের মধ্যে শীর্ঘস্থান অধিকার করে প্রাপ্তহন তরীকতের সর্বোচ্চ খিলাফত। এই তরিকা নক্সাবন্দ-মুজাদ্দেদী তরিকা নামে পরিচিত। খাজা এনায়েতপুরী ভোগবিলাসী জীবনযাপনের চরম বিরোধী ছিলেন। তিনি ইসলামের মর্মবাণী-তরিকত দর্শন প্রচারের পাশাপাশি সমাজসেবা মুলক কাজেও রেখেছিলেন অনন্য অবদান। খাজা এনায়েতপুরী কে ভক্তবৃন্দ সুলতানুল আউলিয়া এবং চিরস্থায়ী সংস্কারের জন্য ‘‘আখেরী মুজাদ্দেদ’’ বলে অভিহত করেন। তিনি ১৯৫২ সালে ইন্তেকাল করেন। হযরত শাহ সুফী আফজাল মাহমুদ (রহঃ) সিরাজগঞ্জ আছে এক অলী-আল্লাহর কৃত্রিম মাযার। কৃত্রিম বলার অবশ্যই কারণ আছে। বেলকুচির সমাধিকে সাধারণত পীর সাহেবের দরগাহ নামে আখ্যায়িত করা হতো। জনসাধারণ তার অলৌকিক কার্যাবলীতে মুগ্ধ হলে বহু সম্পত্তি দান করে। এ গুলি পীরোত্তর সম্পত্তি। বড় বাজু পরগনায় যে যে স্থানে তার সম্পত্তি ছিল সেসব স্থানে একটি করে কৃত্রিম দরগাহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। শাহ আফজাল মাহমুদ সাহেব সাহেব অবিবাহিত ছিলেন। তার ইন্তিকালের পর তার একমাত্র ভ্রাতা আলী মাহমুদের ছেলে ফয়েজ আলী সমপত্তির অধিকারী হন। ফয়েজ আলীর পর তঃপুত্র মেহের আলী, মেহের আলীর পুত্র রজবালি এবং রজবালির পুত্র সিরাজ আলী পীরোত্তর সম্পত্তির উত্তধাধিকারী হয়েছিলেন। সিরাজ আলী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তার নামানুসারে সিরাজগঞ্জ নামকরণ করা হয়েছে বলে প্রকাশ। বর্তমানে আফজালপুর অঞ্চল আংশিকভাবে যমুনা নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। এরুপ জনশ্রুতি আছে যে, তার নামে সিন্নি মাতন করলে অসাধ্য সাধিত হতে পারতো। এ বিশ্বাস হিন্দু মুসলমানরাই করতেন। তবে বাঙালি অপেক্ষা মারোয়াড়ী সমপ্রদায় ছিল পীর আফজাল মাহমুদের বেশী ভক্ত। ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে এই সাধকের মৃত্যু হলে তার কয়েক পুরুষ পর সিরাজ আলী চৌধুরী উক্ত জমিদারী উত্তরাধিকার সুত্রে লাভ করেন। হযরত মখদুম শাহদৌলা (রহঃ) ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১২৯২-৯৬ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দু অধ্যুষিত শাহজাদপুরে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে আরবের ইয়েমেন থেকে শাহজাদা বংশের হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়েমেনী (রঃ) ও তার ওস্তাদজী হযরত শাহ শামসুদ্দিন তাবরেজী (রহঃ) এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহ হাবিবুল্লাহ হযরত বদরুদ্দিন (রহঃ) ও হযরত শাহ ইউসুফ (রহঃ) সহ একটি ইসলাম প্রচারক মুসল্লীদল এখানে আগমন করেন। এখানে প্রতিষ্ঠিত করা মখদুমীয়া জামে মসজিদ। এক সময়ের হিন্দু অধ্যূষিত শাহজাদপুরে প্রথম মুসলিম বিজয় কেতন উড়ান হযরত মখদুম শাহদৌলা ইয়েমেনী (রহঃ)। করতোয়া নদীর কোল ঘেষে তিনি তাবু তৈরী করে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে শাহাদত বরণ করলেও তাঁর অনুসারীরা মরণপণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন।