স্মরণীয় যাঁরা বরণীয় যাঁরা

চর্যাপদ এবং মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৩, ১৯:৫২
‘টালত ঘর মোর নাহি পড়বেসী / হাড়ীত ভাত নাই নিতি আবেশী’ কিম্বা ‘নগর বাহিরিরে ডোম্বী তোহরি কুড়িয়া’ কিম্বা ‘উঁচা উঁচা পাবত তহি বসহি সবরী বালী / মোরাঙ্গ পিচ্ছ পরিহাণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী’। প্রাচীন বাংলায় মানুষের জীবনের এমন বহু চিত্র আছে যে গ্রন্থটিতে সেই গ্রন্থের নাম চর্যাপদ। বৌদ্ধ সহজিয়া সাধন সঙ্গীত হলেও এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। এই গ্রন্থটির আবিষ্কারক শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, বহু ভাষাবিদ, দার্শনিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং ঐতিহাসিক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তাঁর আদি নিবাস উত্তর ২৪ পরগণার নৈহাটি গ্রাম। তিনি জন্মগ্রহণ করেন খুলনা জেলার কুড়িমা গ্রামে ৬ ডিসেম্বর ১৮৫৩ সালে। প্রাচীন সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বহু নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কারের জন্য তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তোমরা হয়তো মনে করতে পারো- অর্থ না থাকলে উচ্চ শিক্ষা কিম্বা ভালো ফলাফল অর্জন সম্ভব নয়; কিন্তু আমরা প্রতিবার মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের পরেই লক্ষ্য করি লাখের মধ্যে কজন মেধাবী মুখ যাদের অসহায়ত্ব, দারিদ্র্য কোনোকিছুই মেধা বিকাশে অন্তরায় হতে পারেনি। এমনি একজন অমিত প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহারা হন। ছাত্র পড়িয়ে নিজের পড়ার ব্যয় নির্বাহ করতে থাকেন। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, একাগ্রতা তাঁকে জীবনের প্রথম পরীক্ষাটিতেই সাফল্যের স্বর্ণদ্বারে পৌঁছে দেয়। কলকাতা সংস্কৃত কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস (১৮৭১) এবং এফ.এ (১৮৭৩) পরীক্ষায় ১৯তম স্থান অধিকার করে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৮৭৬-এ ৮ম স্থান অধিকার করে বি.এ ডিগ্রী অর্জন করেন। বি.এ পরীক্ষায় সংস্কৃতে প্রথম হওয়ায় প্রতি মাসে ৫০ টাকা করে ‘সংস্কৃত কলেজে স্নাতক বৃত্তি’, ২৫ টাকা করে ‘লাহা বৃত্তি’ এবং ‘রাধাকান্ত দেব মেডেল’ লাভ করেন। ১৮৭৭-এ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে সংস্কৃতে এম.এ ডিগ্রি অর্জন এবং কৃতিত্বের জন্য ‘শাস্ত্রী’ উপাধি লাভ। ভাবো একবার, মেধার চর্চাই মেধার বিকাশ ঘটায়। প্রতিনিয়ত অনুশীলন আর আত্মবিশ্বাসের দ্বারাই তোমরা তোমাদের ভবিষ্যত্ জীবনের রূপকল্প নির্মাণ করতে পারবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা এবং সরকারী উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯০৭ সালে নেপালের রাজগ্রন্থশালা থেকে উদ্ধার করেন দুষ্প্রাপ্য কিছু পুঁথি। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো ‘চর্যাচর্য্য বিনিশ্চয়’। তিনি ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে উদ্ধারকৃত পুঁথিগুলো একত্রে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থটি ‘চর্যাপদ’ বা ‘চর্যাগীতি’ নামে বহুল পরিচিত। চর্যাপদের ভাষা বর্তমান বাংলা ভাষার মতো নয়। তবে এর ব্যাকরণগত বিশ্নেষণ করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এর ভাষা বাংলা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ছাত্রজীবনেই ‘ভারত মহিলা’ প্রবন্ধ রচনা করে হোলকার পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি বাল্মীকির জয় (১৮৮১), মেঘদূত ব্যাখ্যা (১৯০২), হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা (১৯১৬), প্রাচীন বাংলার গৌরব (১৯৪৬) প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ১৮৯৮ তে ‘মহামহোপাধ্যায়’ এবং ১৯১১ তে সি.আই.ই উপাধি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত হন (১৯২৭)। এই বিদ্বজ্জন মনীষীর মহাপ্রয়াণ ঘটে ১৯৩১-এর ১৭ নভেম্বর।