মিসরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থক ও তার বিরোধীদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। গত শুক্রবারের সংঘর্ষে একজন মার্কিন নাগরিকসহ কমপক্ষে তিনজন নিহত হয়েছে। সারা দেশে আহত হয়েছে প্রায় দুইশ মানুষ। একদল চাইছে প্রেসিডেন্টকে হটাতে, অন্যদল চাইছে প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করতে। এ অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি উত্যাপন করতে হয়েছে মুরসিকে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইসলামপন্থী নেতা মুরসির দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি হয়েছে গতকাল রবিবার। এই দিনেই তার অপসারণ চেয়ে দেশব্যাপী তুমুল বিক্ষোভ হয়। এক সপ্তাহ আগেই এ বিক্ষোভের ঘোষণা দেয় বিরোধীরা। প্রস্তুতি হিসেবে ছোটখাটো বিক্ষোভ শুরু হলে তাদের রুখে দিতে মুরসির সমর্থক মুসলিম ব্রাদারহুডের কর্মী-সমর্থকেরা রাজপথে নামে। ক্ষমতাসীন ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (এফজেপি) আদর্শিক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড দাবি করেছে, আলেকজান্দ্রিয়াসহ আটটি স্থানে তাদের কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এ সময় সংঘর্ষে সরকারবিরোধী একজন প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়। গতকাল রবিবার পূর্বঘোষিত গণবিক্ষোভে যোগ দিতে কায়রোর তাহরির স্কয়ারে বিক্ষোভকারীরা তাঁবু ফেলে জড়ো হতে শুরু করে।
দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ মিসরের ক্ষমতায় আসার এ বছরের মধ্যে কঠিন বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। সরকারের এক বছর পালিত হয়েছে গণ অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দমন করে। মূলত ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই দেশটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন মুরসি। বিশেষ করে বিচার বিভাগ, পুলিশ, গণমাধ্যম এবং সর্বশেষ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে চরম তিক্ত সম্পর্কের সূচনা হয়। যদিও ১০০ দিনের মধ্যে দেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। বিরোধীরা ৩০ জুন বিক্ষোভের ঘোষণা দেয়ায় তাদের সাবধান করে দীর্ঘ বক্তব্যও দিয়েছেন তিনি। তিনি ভাষণে বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকে সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উত্খাতের জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এ ধরনের বিষাক্ত পরিবেশে কীভাবে একজন ভাল নেতা বড় কিছু করতে পারে? গত এক বছরে ৪ হাজার ৯শ ধর্মঘট ও লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুতরা দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে।
বর্তমানে সরকার সমর্থক ও সরকার বিরোধীদের বিভক্তি চরমে। বামপন্থি, উদারপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষরা এখন বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। যদিও তাদের একক কোনো দাবি বা লক্ষ্য নেই। তারা বলছেন, ৩০ জুন হলো মুরসি সরকারের শেষ দিন। হোসনি মুবারককে ক্ষমতা থেকে সরানোর মতো এবার মুরসিকেও তারা সরিয়ে দিতে চায়। তারা ফুটবলের লাল কার্ড নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেয়। জাতিসংঘের সাবেক কূটনীতিক ও বিরোধীদের মধ্যে অন্যতম পরিচিত মুখ মোহাম্মদ এল বারাদি আরব পত্রিকা আল হায়ােক বলেন, বিপ্লব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিরোধী দল বলছে, প্রেসিডেন্ট ও তার দল মুসলিম ব্রাদারহুড দেশকে ইসলামী রাষ্ট্র বানাতে চাইছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামপন্থিদের নিয়োগ দিচ্ছে।
গত এপ্রিলে হতাশ যুবকেরা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে প্রথম বিক্ষোভ শুরু করে। কয়েকটি বিরোধী দল এতে সমর্থন দেয়। মুরসির পদত্যাগ চেয়ে তারা প্রায় দেড় কোটি লোকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। বিক্ষোভকারী যুবকদের প্রতিনিধি মাহমুদ বদর বলেন, মুসলিম ব্রাদারহুড প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এটা মানুষের অনাস্থার প্রকাশ। এসব স্বাক্ষর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করা হবে। যাতে মুরসিকে সরিয়ে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত একজনকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করা হয়। অন্যদিকে, মুরসির সমর্থনে গত সপ্তাহে লাখ লাখ মানুষ কায়রোতে মিছিল করে। এর মাধ্যমে সহজেই বোঝা যাচ্ছে, মিসর এখন দুই ভাগে বিভক্ত। সরকারের সমর্থকরা বলেছে, মেয়াদের শেষ পর্যন্ত যেভাবেই হোক প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় রাখা হবে। এদিকে, বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে ও পরিস্থিতি রক্ষায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার দায়িত্ব নিয়োজিত রাখা হয়েছে।
সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীরা তামারুদ (বিদ্রোহী) এবং সরকারপন্থিরা তাগারুদ (নিরপেক্ষ) নামে পরিচিত। তাগারুদদের মতে- মুরসির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অসাংবিধানিক। কারণ তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন; কিন্তু তামারুদরা বলছেন, মুরসি অঙ্গীকার করেছিলেন মিসরে বড় পরিবর্তন আনবেন। পরিবর্তন আনতে মুরসি ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্য তাকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
দুই পক্ষই গণমাধ্যমে মতামত জানাচ্ছেন। বর্তমানে গণমাধ্যম অতীতের থেকে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। প্রতিদিনই সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছেন মুরসি। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা কমে যাওয়ার জন্যও প্রেসিডেন্ট মুরসির প্রতি ক্ষিপ্ত সাধারণ মানুষ। বিদ্যুত্, পানি, জ্বালানির সরবরাহ কমে যাচ্ছে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। এছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থারও দিন দিন অবনতি হচ্ছে। এসব কারণে জনরোষের মুখে থাকা মুরসি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তাতে রাজি হচ্ছে না বিরোধীরা। এ অবস্থায় মুসলিম ব্রাদারহুডের সিনিয়র নেতা মোস্তফা আল-ঘেনেমি বলেন, এ আচরণ অযৌক্তিক। প্রতি দুই, তিন মাস পর পর তারা প্রেসিডেন্টের পরিবর্তন চাইছে। তাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট উত্খাতের মোহ কাজ করছে।
