ইন্টারনেটে নজরদারি করার যুক্তরাষ্ট্রের অতি গোপন কর্মসূচির কথা ফাঁস করে দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সিআইএ’র সাবেক গোয়েন্দা কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন। এরই মধ্যে তার পাসপোর্ট প্রত্যাহার করেছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। বৈধ পাসপোর্ট না থাকা সত্ত্বেও স্নোডেন ইকুয়েডর বা ভেনিজুয়েলা যাবার আশা করছেন; হয়তো যাবেনও। তার মানে, পাসপোর্ট ছাড়াও বৈধভাবে বিদেশে অবস্থান বা সফর করা যায়।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট স্নোডেনের পাসপোর্ট প্রত্যাহার করে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং কোন দেশ যাতে তাকে আশ্রয় না দেয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি ওয়াশিংটনের হুমকি-ধমকি বা অনুরোধ অব্যাহত আছে। এডওয়ার্ড স্নোডেন যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তির মামলার আসামি, যিনি হাওয়াই থেকে সোজা হংকংয়ে পালিয়ে যান। এরপর গত ২৩ জুন সেখান থেকে বিমানে মস্কো উড়াল দেন যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টে। স্নোডেন এখন ইকুয়েডর ও ভেনিজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। গত সোমবার মস্কো থেকে কিউবাগামী একটি বিমানে স্নোডেনের নামে টিকেট বরাদ্দ ছিলো। কিন্তু তার নির্দিষ্ট আসনটি ফাঁকা গেছে হাভানায়।
আন্তর্জাতিক সফরের একটি শর্ত হলো পাসপোর্ট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তি পাসপোর্ট ছাড়াই বিদেশ সফর করতে পারেন? উইকিলিক্সের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মতে, স্নোডেনের বিশেষ শরণার্থীর প্রমাণাদি আছে, যা ইকুয়েডর তাকে দিয়েছে। লাখ লাখ শরণার্থী পাসপোর্ট ছাড়াই সীমান্ত অতিক্রম করে, কারণ তারা যুদ্ধ বা নির্যাতন থেকে নিজেদের জীবন বাঁচাতে চায়। ২০১২ সালে এভাবেই ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ শরণার্থী হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। পাটপোর্ট না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তাকে নিজের পরিচয় জানাতে হয়। এজন্যে কিছু প্রমাণাদিও উপস্থাপন করতে হয় তাকে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা ল্যারি ইয়াঙ্ক জানান, অনেক সময় কিছু শরণার্থীর পরিচয় বা কাগজপত্র না জেনে শুধু তার নাম তালিকাবদ্ধ করেই তাকে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক কমিটির প্রধান ল্যাভিনিয়া লিমন জানান, আসলে কোন দেশ পাসপোর্ট ছাড়া ভিনদেশি কাউকে তার দেশে ঢুকতে দেবে কিনা, তা পুরোপুরিই ঐ দেশের ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্রই প্রতিবছর সারাবিশ্বের প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে শরণার্থী মর্যাদায় আশ্রয় দেয়। এদের মধ্যে খুব স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তিরই পাসপোর্ট থাকে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কর্মকর্তারা তাদের সরাসরি ইন্টারভিউ নেন। নিশ্চিত হন, আগ্রহী ব্যক্তিটি আসলেই শরণার্থী হবার যোগ্য কি-না। পাসপোর্টের পরিবর্তে তাকে দেয়া হয় আই-৯৪ নামের একটি প্রমাণপত্র। সেই সাথে প্রত্যেকে যাতে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদে প্রবেশ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নেয়া হয়। লিমন আরো বলেন, ‘ধর আমরা এখন মালয়েশিয়া থেকে লোক নিচ্ছি। তবে তাদের লস অ্যাঞ্জেলসে আসার আগে অবশ্যই হংকং হয়ে আসতে হবে। কারণ হংকংই সেই কাজটি করে; শরণার্থী মর্যাদা নিশ্চিত করে এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছার ব্যবস্থা করে’। ব্রিটেন ও কানাডাতেও একই পদ্ধতি চালু আছে। এমনকি আন্তর্জাতিক রেডক্রসও এ ধরনের কাগজপত্র বিতরণে সহযোগিতা করে।
আইনজীবীদের মতে, যদি কোন দেশ তার রাষ্ট্রীয় বিমানে কাউকে সফরের অনুমতি দেয়, তবে তাতে কারো কোন সমস্যা হবার কথা নয়। তাই বৈধ কাগজপত্র ছাড়াও তাকে সফর করতে দেয়ার অধিকার রাখে সেই দেশ। বিদেশে পাসপোর্ট হারিয়ে বা চুরি গেলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঐ দেশ সফর করার অধিকার রাখেন। দিনের পর দিন নতুন পাসপোর্টের জন্য তিনি ঘোরাঘুরি করতে পারেন বা বিমানেও উঠতে পারেন স্বাধীনভাবে, তবে অবশ্যই ঐ ব্যক্তির সাথে থাকতে হবে তার দেশের কনস্যুলেটের দেয়া সনদ, যাতে বলা থাকবে, এই ব্যক্তি অমুক দেশের বৈধ বা জন্মসূত্রে নাগরিক। তাকে তার গন্তব্যে যেতে দেয়া হোক।
কিছু দেশের মধ্যে বিশেষ দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের কারণেও ঐ সব দেশের নাগরিকরা পাসপোর্ট ছাড়াই সফর করতে পারেন। যেমন— যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা পুয়ের্তোরিকো এবং গুয়ামে পাসপোর্ট ছাড়াই সফর করতে পারেন। তবে তাদের শুধু দরকার পড়ে একটি ফটো আইডি। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিকরা নেক্সাস কার্ড দেখিয়েই একে অন্যের দেশ সফর করতে পারেন। তবে বিমানে সফর করতে গেলে তাদের সব সময়ই পাসপোর্ট দরকার হয়।
আমেরিকানদের জন্য উত্তর আমেরিকায় পাসপোর্টের নিয়ম-কানুন বা বাধ্যবাধকতায় কিছু ব্যতিক্রম পাওয়া যায়। যেমন— সড়ক বা সমুদ্র পথে বারমুডা বা ক্যারিবিয়ান কোন দেশে যেতে পাসপোর্ট বইয়ের বদলে পাসপোর্ট কার্ড গ্রহণযোগ্য। এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্স বা সামরিক পরিচয়পত্রও যথেষ্ট। যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড নিজেদের জন্য একটি সাধারণ ভ্রমণ এলাকা ঘোষণা করেছে। তাতে উভয় দেশের নাগরিকরা শুধু ফটো আইডি নিয়েই ঘুরতে যেতে পারেন। অভিবাসন কর্মকর্তারা জাতীয়তার প্রমাণপত্র দেখতে চাইতে পারেন। তাই সরকারের পক্ষ থেকে সব সময়ই নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র সাথে রাখতে বলা হয়।
১৯৯৫ সালে অবাধ ও মুক্ত চলাচলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৬টি দেশ গঠন করে স্কেনজেন এরিয়া, যেখানে সীমান্তে কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কিন্তু বিমানে ঐ সব দেশের যাত্রীদের পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। বিড়ম্বনা এড়াতে এখনো তারা সাথে রাখেন বিভিন্ন কাগজপত্র। কেউ কেউ পাসপোর্টও রাখেন। পশ্চিম আফ্রিকার অর্থনৈতিক জোট- ইসিডব্লিউএএস, কোঅপারেশন কাউন্সিল ফর দ্য আরাব স্টেটস অব দ্য গালফ এবং মারকোসুর ইন সাউথ আমেরিকা’সহ কিছু আঞ্চলিক সংস্থা আছে, যাদের সদস্য দেশগুলোতে নিজেদের সফরের জন্য পাসপোর্টের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্রই গ্রহণযোগ্য। তবে এক্ষেত্রে বিশ্বে একমাত্র ব্যতিক্রম ব্রিটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ব্রিটেনের পাসপোর্ট রাণীর নামে ইস্যু করা হয়, তাই তার নিজের কোন পাসপোর্ট নেই। কোন দেশ সফর করতে তার পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজনও পড়ে না।
