নুরুল করিম
লাল-সবুজ পতাকা জড়িয়ে বিদেশের মাটিতে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন সবারই থাকে। কিন্তু পথশিশুরা? তাঁদের কী ইচ্ছে হয় না দেশের হয়ে কিছু করার? বোধহয় ‘না’। কারণ তাঁদের দিন কাটে দু-মুঠো খাবারের সন্ধানে। ভালোভাবে একবেলা খেতে পারলে তাতেই তাঁরা খুশি। মোহাম্মাদ রুবেলের আগের গল্পটাও এমন ছিল। স্কুল যাওয়া চিন্তা-ভাবনা ছিল না, কাগজ-প্লাস্টিক কুঁড়িয়ে দিন পার করতেন। রাতে সেই বস্তা বুকে নিয়েই ঘুমাতেন। হটাত্ তাঁর বুকের বস্তাটা সরিয়ে দিলো লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো)। সংস্থাটি তাঁকে দু-মুঠো খাবারের বদলে দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখালো। সেই স্বপ্ন নিয়েই ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রেখেছিল রুবেল।
রুবেল ছাড়াও আরজু রহমান, জেসমিন আক্তার, স্বপ্না আক্তার, সানিয়া মির্জা, রাসেল ইসলাম, আবুল কাশেম ও নিজাম হোসেন আছেন সেই দলে। এদের কারো হয়তো মা-বাবা মারা গেছেন অথবা মা বা বাবা আরেকটি বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছেন।
কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথে নেমে এসেছে। কেউ কেউ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে পথে আশ্রয় নিয়েছে। এই পথেই তাঁরা আবার নানা নির্যাতনের শিকার হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেন। তাঁদের সবকিছু তিনিই দেখাশোনা করেন। তার তত্ত্বাবধানেই ‘স্ট্রিট চাইল্ড’ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে। কীভাবে সুযোগ পেল, তা জানার আগে জানবো লিডো ও পথশিশুদের নিয়ে।
লিডো থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে
কেরানীগঞ্জের বসিলায় এই ৮ জনসহ ৫৩ শিশু থাকে। তাঁদের স্কুল বা আবাসনটির নামও দেওয়া হয়েছে, ‘লিডো পিস হোম’। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ঢুকতেই সুন্দর বাগান, আর সেটা শিশুদের যত্নে গড়া। ভেতরে বাচ্চারা পড়াশোনায় ব্যস্ত। তিনরুমের প্রতিটিই নিজেদের পছন্দের রঙ দিয়ে সাজিয়েছে শিশুরা। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে হোমের শিশুদের ছবি, ছবির নিচে সাদা কাগজে লেখা প্রত্যেকের স্বপ্ন ও লক্ষ্যের কথা। পথশিশু হলেও এখন আর তাঁদের পথে থাকতে হয় না। থাকা, খাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলাসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা তাঁরা পাচ্ছে লিডো থেকে।
নিজেদের কোনো মাঠ নেই, আশেপাশের বিভিন্ন মাঠে তাঁরা ক্রিকেট প্র্যাকটিস করে। বছর দুয়েক আগেও তাঁরা জানতো না এই মাঠ থেকে লর্ডসে খেলার সুযোগ পাবে। কিভাবে এ সুযোগ পেল তাঁরা? জানতে চাইলে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন জানালেন, লন্ডনের স্ট্রিট চাইল্ড ইউনাইটেড এই বিশ্বকাপে খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের পাশাপাশি পথশিশুদের নিয়ে এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পথশিশুদের প্রতি যে অবজ্ঞা, অবহেলা তা দূর করা এবং সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা। এতে বাংলাদেশ, ইংল্যান্ডসহ ১০টি দেশের ৮০ জন পথশিশু (যাঁরা এক সময় পথে ছিল) অংশ নেয়। সব দেশ থেকে ৪ জন মেয়ে এবং ৪ জন ছেলে শিশুকে নির্বাচিত করা হয়।
বাঁধা যখন পাসপোর্ট!
এমন সুযোগের কথা শুনে বেশ ভালোভাবেই প্র্যাকটিস করা শুরু করেন বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণের জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকা এই ৮ জন, পৃথিবী যাঁদের চেনে পথশিশু হিসেবে। তাতেই বিপত্তি! তাঁরা পথশিশু, তাই তাঁদের পাসপোর্ট নেই। এদিকে বৈধ অভিভাবক না থাকার কারণে স্ট্রিট
চিলড্রেন ক্রিকেট বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হয়েও শুরুতে তাঁদের লন্ডন যাওয়া ছিল সংশয়ের মুখে।
নিয়ম অনুযায়ী, পথশিশুদের পাসপোর্টের জন্য বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। অভিভাবকহীন শিশুদের পাসপোর্টের জন্য আদালতের মাধ্যমে সবার আগে বৈধ অভিভাবক নির্ধারণ করতে হয়। আদালতের অনুমতির পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। এরপরই পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব। বিষয়টা বেশ সময়সাপেক্ষ। এছাড়া সব প্রক্রিয়ার মধ্যে পাসপোর্ট পেতে বিলম্ব হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। এগিয়ে আসে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ২১ জানুয়ারি বিসিবির নির্বাহী পরিচালক নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর সই করা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তর বরাবর এক চিঠিতে এই ৮ শিশুর পাসপোর্ট ইস্যু করতে লিডো কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এরপর মিটে যায় সকল সমস্যা। সেইসঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই শিশুদের জন্য একজন প্রশিক্ষকের ব্যবস্থাও করে দেন। মোহাম্মদপুরের একটি মাঠে প্রশিক্ষকের অধীনে ক্রিকেট প্র্যাকটিস করার সুযোগ পায় তাঁরা।
বিশ্বকাপে সাফল্য
গত ৩০ এপ্রিল ইংল্যান্ডে শুরু হয় ‘স্ট্রিট চাইল্ড’ বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টটির আয়োজনের দায়িত্বে ছিল স্ট্রিট চাইল্ড ইউনাইটেড। ভেন্যু ক্যামব্রিজের পার্কারস পিস। যেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ আরো ৯টি দল। যারা সকলেই পথশিশু।
গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ তাদের প্রথম তিন ম্যাচে দুটিতেই জয় তুলে নিয়েছিল। ৪ তারিখ মরিশাসকে ১৭ রানে হারায় বাংলাদেশ। মরিশাসকে ৪৯ রানের লক্ষ্য ছুঁড়ে দেয় তারা। তাড়া করতে নেমে মরিশাসের শিশুরা সক্ষম হয় ৩১ রান করতে। বাংলাদেশ জয় পায় উইন্ডিজের বিপক্ষেও। উইন্ডিজ ১ উইকেট হারিয়ে রান করে ১১। কোনো উইকেট না হারিয়ে ১৩ রান করে ম্যাচ জিতে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু থমকে যেতে হয় সেমিফাইনালে গিয়ে। ভারত দক্ষিণের কাছে পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ। সিক্স-এ-সাইড সংস্করণের এ ম্যাচে ২ উইকেটে ৫২ রান তোলে ভারত। ৫৩ রানের জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশ কোনো উইকেট না হারিয়ে ৩৫ রান করতে সক্ষম হয়। ১৭ রানের জয় পেয়ে ফাইনালে ওঠে ভারত।
৭ মে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ৫ রানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সাউথ ইন্ডিয়া। ‘ক্রিকেটের মক্কা’ লর্ডসে অনুষ্ঠিত ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে সাউথ ইন্ডিয়া ১ উইকেট হারিয়ে করে ৪৮ রান। জবাবে ৪৮ রান তাড়া করতে নেমে ৩ উইকেট হারিয়ে ৪৩ রানেই থেমে যায় ইংল্যান্ডের ইনিংস।
মূলত বিশ্বব্যাপী পথশিশুদের একত্র করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ করে দেওয়াই স্ট্রিট চাইল্ড ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের লক্ষ্য। এবারের আসরে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ। আর প্রথম আসরেই সেমিফাইনালে উঠে চমক সৃষ্টি করে বাংলার সুমি, আরজু, সানিয়া, জেসমিন, নিজাম, কাশেম, রুবেল ও রাসেলরা। এসব অবহেলিত শিশুর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করার ক্ষেত্রে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে আয়োজক কমিটি।
