জারি-যাত্রার একাল-সেকাল

আপডেট : ১২ মে ২০১৯, ১৭:৪৫

পলাশ রায়

 

চারদিকে বয়ে চলা শান্ত নদী সুগন্ধা, বিশখালি, বাসন্ডা, হলতা, ধানসিঁড়ির ছলাত্ ছলাত্ ঢেউ গুনতে গুনতেই যেন দখিন জনপদের ঝালকাঠির মানুষজন এমনিতেই কবি হয়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে এমন কথা প্রচলিত রয়েছে। তাই বারো মাসের তের পার্বণে এখানকার মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই উত্সবপ্রিয় এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠতো। যদিও আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে আজ সেসব আমাদের কাছে হারানো ঐতিহ্যের জাবর কাটা মাত্র।  তবে আমাদের যেদিন ছিল তা আসলেই মাথা উঁচু করার মতো এবং অহঙ্কারের।

অবিভক্ত বাংলায় যাত্রাপালার পথপ্রদর্শক হিসেবে ধরা হয় শশীভূষণ নট্টকে। যাঁর যাত্রাপালা ভারত বর্ষের দুই বাংলায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে। ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের পাঞ্জিপুঁথি পাড়া গ্রামের নট্ট বাড়ির সন্তান ছিলেন তিনি। কেবল তিনিই নন, সংগীত, যাত্রা আর পালা গানে এ বাড়ির আরো অনেকে স্বনামধন্য ছিলেন। নদীমাতৃক এ জেলায় জন্মেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আমলের জারি সম্রাট খ্যাত আব্দুল গণি বয়াতি, কালাকেষ্ট,  হয়লা ও পালা গানের সম্রাজ্ঞি খ্যাত আয়লা বিবিসহ অনেক গুণীজন। এ জেলার লোককাহিনি নিয়েই বিখ্যাত গুনাই বিবি ও আসমান সিংহের পালার মতো অসংখ্য পালাগান দেশব্যাপী আয়োজনে দর্শক-শ্রোতাদের কাছে ছিল প্রথম পছন্দ। আর হারানো সেসব দিনে ঝালকাঠির শহর কিংবা গ্রামাঞ্চলে যাত্রাপালা, জারি, সারি, হয়লা, রয়-আনি, কবিগান ও পালা গান মাটি ও মানুষের প্রাণের সংস্কৃতিতে মুখর ছিল। কিন্তু আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা, জারি-সারি, পালা ও কবিগানসহ অনেক প্রাচীন সংস্কৃতি। ফলে এ শিল্পে জড়িতদের জীবন জীবিকায় যেমন নেমে এসেছে দুর্দিন তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐহিত্য।

ঝালকাঠি শহরের প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মনোয়ার হোসেন খান বলেন, ‘আমাদের ছেলেবেলায় ঘরে ঘরে হারমোনিয়ামের শব্দে পাড়ায় পাড়ায় সন্ধ্যা নামতো। আর এখন গভীর রাতেও ছেমেমেয়েরা বিকট শব্দে সাউন্ড বক্স বাজায়। তা কানে ঢোকে কিন্তু মনের ভেতর স্পর্শ করেন।’ ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তি নাটক, যাত্রাপালাসহ ঝালকাঠির অনেক গৌরবের অতীত সাংস্কৃতিক স্বাক্ষী। এখনো সময় পেলে কবিতা ও গান লেখেন। নাটক, যাত্রায় অংশ নেন।

ঝালকাঠির সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের মহোদীপুর গ্রামে জন্মেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আমলের জারি সম্রাট খ্যাত আব্দুল গণি বয়াতি। তিনি ছিলেন একজন স্বভাব কবিও। ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে গান রচনা করে এবং তা তাত্ক্ষণিকভাবে গেয়ে আইয়ুব খানকেও অবাক করেছিলেন এই গুণী মানুষটি। কয়েক হাজার জারি গান লিখে এবং নিজের দল নিয়ে সারাদেশে তা পরিবেশ করেছেন আব্দুল গণি বয়াতি। ঝালকাঠিতে তাঁর বয়াতি বাড়িতে ৪ পুরুষ এই সংগীত সাধনা এখনো ধরে রেখেছেন। গণি বয়াতির মেঝো ছেলে আব্দুল হক বয়াতি বাবার পেশা আঁকড়ে ধরে রেখে জীবন-জীবিকা চালাতে বড়ই ক্লান্ত এখন। আব্দুল হক বয়াতি জানান, এখন সমাজ আধুনিক হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানারকম অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। কিন্তু জারি শিল্পীদের সেখানে স্থান হয় না। অনাদরে তাঁর পাইলদারদের (সহযোগি) অনেকেই পেশা ছেড়েছেন। সরকারি আয়োজনে তিন থেকে সাত দিনব্যাপী মেলা হয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় কিন্তু সেখানে ডাক পড়ে নাচ-গানের শিল্পীদের। বাউল কিংবা জারি গানের স্থান হয় না—আক্ষেপ করে বলেন আব্দুল হক বয়াতি।

ঝালকাঠির সদর উপজেলার বারুহার গ্রামের আরেক গুণীজন সোহরাব বাউল। বাবার পাইলদার থেকে শুরু হওয়া এ শিল্পী এখনো পেশা ছাড়তে পারেননি। হাটে হাটে হকারি করে ভেষজ ওষুধ বেঁচে সংসার চলে তাঁর। আর গ্রামীণ উত্সব আয়োজনে নিজের লেখা গান গেয়ে জোগান মনের খোরাক। বরিশাল বেতারের নিয়মিত শিল্পী সোহবার বলেন, ‘আঞ্চলিক ভাষায় সংসারের সুখ-দুঃখ, দেহতত্ত্ব কিংবা ভাব-ভালোবাসার কথা নিয়ে দেশি বাদ্যযন্ত্রে নিজের লেখা গান গাই। কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা আমাদের গান পছন্দ করে না। গ্রামবাংলার এসব গান-বাজনা অনেকটা অবহেলার চোখেই সবাই দেখে।’

ঝালকাঠির যাত্রাদলের সংগঠক দুলাল দাস। বয়োজ্যেষ্ঠ এ মানুষটি রোগ-শোকে এখন অনেকটা নিশ্চুপ। তবু শহরের পূর্ব চাঁকাঠিতে নিজের প্রতিষ্ঠিত শিশুসংগীত সংগঠন খেলাঘর আসরটি এখনো সচল রেখেছেন। এক সময় জেলাজুড়ে নিজের দল নিয়ে যাত্রা করে বেড়াতেন। উত্সব আয়োজনে দুলাল দাস ছিলেন অন্যতম পরিশ্রমী একজন সংগঠক। তিনি বলেন, ‘৭৫-এর পর থেকে দেশে যাত্রার নামে অশ্লীলতা প্রর্দশন হওয়ায় নতুন প্রজন্মের কাছে যাত্রাশিল্প কদর পায়নি।’ কিন্তু যাত্রাই সাহিত্যে বা শিল্পের আদি নিদর্শন উল্লেখ করে দুলাল দাস বলেন, ‘সরকারিভাবে প্রায় হারিয়ে যাওয়া এ শিল্পটি বাঁচিয়ে রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি।’ 

এ নিয়ে কথা হয় ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হকের সাথে। তিনি জানান, জেলার গুণী শিল্পীদের সংবর্ধনাসহ বিভিন্নভাবে সাংস্কৃতিক উত্সব আয়োজন করে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে। আর ঝালকাঠির যাত্রাপালা ও জারি গানকে টিকিয়ে রাখতে নেওয়া হবে বিশেষ উদ্যোগ।

আজো বাপ-দাদার পেশা আর নেশার এ সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছেন কেউ কেউ। যাত্রার দল, জারি গান, বয়াতি কিংবা বাউল গানের বেশ ক’টি দল ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকাতা পেলে এসব শিল্পীর জীবন-জীবিকার পাশাপাশি ঝালকাঠির গৌরবের সংস্কৃতি রক্ষা পাবে। আর সেইসঙ্গে এ সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতুবন্ধন তৈরি করবে বলে মনে করেন অনেকে। নানা সীমাবদ্ধাতা থাকলেও ঝালকাঠি জেলায় বর্তমানে ৩৭টি সংগঠন তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চলমান রেখেছে। যার মধ্যে রয়েছে যাত্রা, জারি, পালা ও বাউল গানের মতো অতীত ঐতিহ্যের সংস্কৃতি।