‘কেউ আমাগো কথা ভাবে না’

আপডেট : ১২ মে ২০১৯, ১৭:৪৬

আজ বয়স বেড়েছে বিলকিস কন্যা ভুলুরও। আর কতদিনই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন তিনি নিজেও জানেন না। সারাক্ষণ তাঁকে তাড়া করে ফেরে নানারকম শঙ্কা। শেষ বয়সে এসে কিছুদিন একটুখানি ভালো থাকতে ইচ্ছে করে তাঁর। কিন্তু কে দাঁড়াবে পাশে। নিয়মিত তাই এফডিসিতে সব লাজ ভেঙেই হাত পেতে সাহায্য নিয়েই তাঁর সংসার চালাতে হচ্ছে। দু-বেলা হয়তো খাবার জোটে। মাঝে মাঝে তাও জোগান দিতে পারে না এক সময়ের অভিনেত্রী ভুলু বারী

তানভীর তারেক

 

এফডিসি চত্ত্বরের খুব চেনা মুখ সে। ঝরনা স্পটে শহরের ব্যস্ততম নায়িকা এসেছে বা নতুন কোনো প্রযোজক। সরাসরি তাঁর কাছে হাত বাড়িয়ে একজন প্রাক্তন অভিনেত্রী বলেন, ‘সংসার চলে না মা, আমারে কিছু সাহায্য করেন। বাসা ভাড়া দিতে পারি নাই। বিদ্যুত্ লাইন কাইটা দিসে।’

—ব্যস্ততম অভিনেত্রী হয়তো তখন নিজের মেকআপ ঠিক করছেন আর বলছেন, ‘উফ! কেন এত ডিস্টার্ব করছে। একে ঢুকতে দিয়েছে কে?’

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কাছে হয়তো এসব সিনেমার কোনো সংলাপের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু এটা আজ সংলাপ নয়। বাস্তবতা।  অভাব আর ভাগ্যের নির্মমতায় সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি পারিবারিক কর্মস্থল এফডিসিতে তিনি নিয়মিত সাহায্যের পানে চেয়ে থাকেন। এক সময়ের এই অভিনেত্রীর নাম ভুলু বারী। তারচেয়েও বড় পরিচয় হলো তিনি এদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর নায়িকা বিলকিস বারীর মেয়ে।

অথচ ভুলু বারীর জীবন তো এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। হয়তো প্রচার বা গণমাধ্যমের আড়ম্বরের অভাবে বিলকিস বারীকে না-ই চিনতে পারে আজকের প্রজন্ম। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের নায়িকা হিসেবেই তাঁকে অনন্য স্থানে রাখাটা জরুরি ছিল। অথচ বাস্তবতা হলো তাঁকে  জীবনের শেষের দিনগুলোতে সংসার চালাতে হাত পাততে হয়েছে মানুষের দ্বারে দ্বারে। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর মেয়ে ভুলু বারীরও জীবন কাটছে মানুষের কাছে হাত পেতে।

কেন তাঁকে এমন কঠিন জীবনের ভেতর দিয়ে আসতে হলো?  এমন প্রশ্নে ভুলু বারী বলেন, ‘অনেকেই আমার মাকে ঠকাইছে। সহজ সরল বইলা কিছু বলেন নাই আমার মা। কাজ করাইছে পয়সা দেয় নাই। কিন্তু কোনোভাবেই আমার মা চলচ্চিত্র ছাড়েন নাই। আমার বাবার সাথে এ নিয়ে বনিবনা হয় নাই। তালাক হয় নাই, তবে তাঁরা আলাদা হয়ে গেছিলেন। এরপর আমার মা আমাদের ৭ ভাই বোনকে মানুষ করতে গিয়ে হিমশিম খেলেন। সব ধরনের চরিত্রে কাজ করতে লাগলেন। সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে আমার মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় ২ হাজার ছবিতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু অনেকরকম চরিত্রে কাজ করতে গিয়ে তিনি নায়িকা ইমেজটা আর ধরে রাখতে পারেননি। নায়ক রাজ্জাক স্যার আমাদের ফ্যামিলির খোঁজ নিতেন। খোঁজ নিতেন জসিম ভাইও। চিত্রনায়ক আলমগীর ভাইয়ের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ। এখনো সবসময় খোঁজখবর রাখেন। আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করেন।  কিন্তু এভাবে কতদিন। শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান আমাকে গত রমজানেও ইফতারের ব্যবস্থা করিয়েছেন। আমি তাঁর প্রতিও কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি চাই কাজের মাধ্যমে আমার এই জীবন জীবিকার একটা স্থায়ী সমাধান।’

ভুলু বারীর আজকের এই অসহায়ত্বের কারণও তাঁর সংসার। মা বিলকিস বারীকেও যেমন অভিনয়ের জন্য শ্বশুরবাড়ির নানা কটুক্তি শুনতে হয়েছে, ঠিক তেমনি ভুলু বারীকেও তাঁর শ্বশুরবাড়ির ভয় ও চাপে চলচ্চিত্রে অভিনয় কমিয়ে দিতে হয়েছে। লুকিয়ে মঞ্চে কাজ শুরু করেন। এক পর্যায়ে স্বামী মারা গেলে সন্তানদের নিয়ে শুরু হয় আবারো সেই একলা সংগ্রামের জীবন।

আজ বয়স বেড়েছে বিলকিস কন্যা ভুলুরও। আর কতদিনই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন তিনি নিজেও জানেন না। সারাক্ষণ তাঁকে তাড়া করে ফেরে নানারকম শঙ্কা। শেষ বয়সে এসে কিছুদিন একটুখানি ভালো থাকতে ইচ্ছে করে তাঁর। কিন্তু কে দাঁড়াবে পাশে। নিয়মিত তাই এফডিসিতে সব লাজ ভেঙেই হাত পেতে সাহায্য নিয়েই তাঁর সংসার চালাতে হচ্ছে। দু-বেলা হয়তো খাবার জোটে। মাঝে মাঝে তাও জোগান দিতে পারে না এক সময়ের অভিনেত্রী ভুলু বারী। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা প্রিয় এফডিসির ভেতরের নানারকম মানুষ আর ব্যস্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীর কাছ থেকে যা পান তা দিয়েই চলে সংসার।

ভুলু বারী বলেন, ‘ফিল্মের কাজ তো কইমা গ্যাছে। আর কিছু কাজ হইলেও এফডিসির বাইরে হয় এখন। আমাগো পরিচিত প্রডিউসাররাও এখন কাজ বন্ধ করে দিছে। এভাবে হাত পেতে সাহায্য নেওয়া ছাড়া কী বা উপায় আমার। আমি তো বাইরে কারো কাছে  চাইতে পারি না। শরম লাগে। আমি, আমার মা তো আজীবন আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছি।’

দৈনিক ইত্তেফাকের এই প্রতিবেদক তার ইন্টারভিউ নিতে গেলে কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন।—‘ও ভাই, আমি তো আপনাগো শিল্পী হিসেবে ইন্টারভিউ দিবার কথা ছিল। আজ আমি অসহায় হয়ে আপনাগো কাছে সাহায্য চাইতেছি। আমাকে অভিনয়ের কাজ দেন। আমি অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। শাবানা আপার নিজেস্ব প্রডাকশনে কাজ করেছি। আজ পুরোনো ডিরেক্টররা তো কাজ করে না। আমাদেরও কেউ মূল্যায়ন করে না। আমার গতরে অন্য কাজ করার আর শক্তি কই? আমাদের দিকে কেউ তাকায় না। কেউ আমাগো কথা ভাবে না। কেউ আমাগো জন্য বলে না।’

প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে গুঙিয়ে কাঁদতে থাকেন ভুলু বারী। খানিক নিজেকে সংযত করে বলেন, ‘আমার মা খুব কষ্ট করে জীবনযাপন করেছে। মানুষের কাছে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে আমাদের বড় করছে। শেষজীবনে শিল্পী হিসেবে সেই মর্যাদা কই পাইলো সে? এইডা কী এই দ্যাশের জন্য লজ্জার না? ’

এখন মায়ের পথেই হাঁটতে হচ্ছে ভুলু বারীকেও। সকাল হলেই চলে আসেন বিএফডিসিতে। পরিচিতদের কাছে টাকা চেয়েই বাড়ি ভাড়া ও পরিবারের খরচ জোগাড় করেন।

বলতে থাকেন, ‘ আমি তো এক সময় নিয়মিত সিনেমায় কাজ করেছি। আমার যখন ৯ বছর বয়স তখন ডাকবাবু ছবিতে নাচের শিল্পী হই। জহির রায়হান সাহেবের সংসার ছবিতেও নাচের শিল্পী ছিলাম। এ দেশের প্রথম চলচ্চিত্রের নায়িকা হিসেবে আমাদের পরিবারের কী কোনো প্রাপ্য নাই? আমার মা-ই কইতো আমি একটা ইতিহাস। আজীবন আমার কথা কইবো বাঙালি। এই অভাবের ইতিহাস দিয়া আমি কী করুম কন। কেউ একটু জিগাই না। কেমন আছেন? কিভাবে চলে আমার সংসার। বাইরে সাহায্য চাইতে শরম লাগে বলে নিজের কাজের জায়গায় মানুষের কাছে হাত পেতে সাহায্য চাই। কাজ চাই কাজ তো পাই না। আমি খুব ভালো অভিনয় পারি। কেউ তো ডাকে না। কিছুদিন আগে শাকিব খানের শুটিং চলছিল। আমি খোঁজ নিয়ে প্রডাকশন ম্যানেজারকে কইলাম আমারে একটা পার্ট দেওয়া যায় না। সে আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলো।’

এভাবে অবজ্ঞা আর প্রত্যাখানের জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন অভিনেত্রী ভুলু বারী। যাঁর মাকে আমরা আমাদের চলচ্চিত্র সমাজ ইতিহাসের পাতায় মর্যাদা দেওয়ার কথা ছিল। অথচ আজ বাস্তবতা উল্টো।

আজ তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। ভুলু বারীর মতে, ‘আমাগো মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী শিল্পীগো খুব মায়া করেন। তাই  আমি তার কাছে গিয়া আমার পরিবার, আমার মায়ের কথা বলতে চাই। আমি বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে গিয়া বলতে চাই যে, আমাদের ফিল্মের প্রথম নায়িকা হিসেবে হলেও আমাকে একটা সম্মানজনক কাজের ব্যবস্থা করে দেন। যাতে আমি দু-বেলা খেয়ে পরে চলতে পারি।’ 

উল্লেখ্য, বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশে অভিনয় করেছেন বিলকিস বারী। এরপর ‘শ্রাবন মেঘের দিনে’, ‘এখন অনেক রাত’সহ প্রায় ৪শ’র অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। বাংলাদেশের (তথা তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি পরিচালনা করেন আব্দুল জব্বার খান। চলচ্চিত্রটি ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পায়। এটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায় একযোগে মুক্তি পায়। প্রথম দফায় মুক্তি পাওয়ার পর এটি ৪৮ হাজার রুপি আয় করে। যা সেসময়ের সিনেমা ব্যবসায় একটি রেকর্ড ছিল।