ব্রাজিলকে তাদের চিরচেনা রূপে ফেরালেন নেইমাররা, তাতে থেমে গেল স্পেনের জয়রথ; আর পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা জিতলো টানা তৃতীয়বারের মতো কনফেডারেশন কাপ। স্পেন এ হারের আগে বিশ্বরেকড ২৯টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলায় (জয় ২৪, ড্র ৫) অপরাজিত ছিল। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলের হারটির পর সর্বশেষ ব্রাজিল তাদের হারালো।
মারাকানা স্টেডিয়ামের লাখো সমর্থকদের জন্য গত রবিবার রাতটা ছিল জাদুকরী অনুভবের; বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে স্পেনের ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় বিস্ময়; আর স্পানিয়ার্ডদের জন্য দুঃস্বপ্নের। ফ্রেডের জোড়া এবং নেইমারের এক গোলে জয়টি অনায়াস হয়ে উঠলেও কোচ লুই ফিলিপ স্কোলারির পুরো দলটিই জ্বলে ওঠে হারানো ‘জোগো বনিতা’কে ফিরে পেতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যে সাম্বা ফুটবলের জন্য বিশ্ব জুড়ে ব্রাজিল সমর্থকদের হাপিত্যেশ করতে দেখা গেছে তারাই এই রাতে মনভরে দেখেছেন স্কোলারির তরুণ তুর্কিদের ছান্দসিক জয়টি। নেইমাররা ঐতিহ্যে ভর করেই ছয় বছর ধরে জয়যাত্রার মধ্যে থাকা বিশ্ব ও দুইবারের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের থামিয়ে দেয় রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত স্টেডিয়ামটিতে।
নেইমারই ছিলেন ব্রাজিলের বিখ্যাত এ জয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে। বার্সেলোনায় নাম লেখানো এই সুপারস্টার বিরতির ঠিক আগে বা পায়ের তীব্র শটে জালের উপরিভাগে বল জড়িয়ে দিয়ে যে গোলটি করেন তাই দৃশ্যত ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করে দেয় স্পেনের। ফ্রেড অবশ্য এর আগে পরে আরো দুই গোল দেন। গোলদাতা হিসেবে এ দুজনের নাম ইতিহাসের পাতায় উঠে এলেও ফুটবলামোদীরা এ রাতের খেলায় ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজ ও থিয়াগো সিলভা এবং মিডফিল্ডার পলিনহোকেও আলাদাভাবে মনে রাখবে।
স্পানিশরা নিজেরাও নিজেদের প্রতি সুবিচার করেননি। সের্জিও র্যামোস ৫৫ মিনিটে পেনাল্টি পেয়েও ব্রাজিল প্রহরী জুলিও সিজারের হাতে তুলে দেন। এছাড়া ছিল জেরার্ড পিকের নেইমারকে ল্যাং মেরে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়া হওয়ার ঘটনা। অথচ তখনো ২২ মিনিটের খেলা বাকি ছিল। ভাগ্যও যেন এদিন সাথে ছিল না অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াসের দলটির। নইলে চেলসি ডিফেন্ডার ডেভিড লুইস কিভাবে সিজারকে পরাস্ত করে নেয়া পেডরোর শটটি গোললাইন থেকে দর্শনীয়ভাবে ফেরান। সিজারই বা নইলে কেন শেষদিকে দুটো গোলের নিশ্চিত শংকা থেকে বাঁচাবেন দলকে।
অবশ্য ইতিহাসও স্পেন কোচ ভিসেন্তে ডেল বস্কের অনুকূলে ছিল না। কেননা ব্রাজিল দল ১৯৭৫ সালের পর আর নিজ মাঠে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলায় হারেনি। এমনকি ব্রাজিলের বিরুদ্ধে নিজের ও বিপক্ষের মাঠ মিলিয়েও কোন স্পেন দলের সর্বশেষ জয়টি ছিল ১৯৩৪ সালের ঘটনা।
অথচ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে মূল প্রশ্নটিই ছিল এই স্পেনকে কিভাবে সামলাবে ব্রাজিল। বিশেষ করে ২১ বছর বয়সী নেইমার দ্য সিলভা সান্তোস জুনিয়র। ফুটবলামোদীদের জিজ্ঞাসা ছিল তিনি কি পারবেন পেলে, রোনালদো, রোমারিওদের যথার্থ উত্তরসূরী হয়ে উঠতে। কনফেডারেশন কাপ জুড়ে সতীর্থদের সাথে মিলে ছন্দময় ফুটবল খেলে সে প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিয়েছেন। এদিনও দেন, বিশ্বের সেরা দুজন গোলরক্ষকের অন্যতম ক্যাসিয়াসকে কামানের গোলা দাগানোর মতো করে জালে পাঠানো শটে পরাস্ত করে। এটা ছিল টুর্নামেন্টে পাঁচ খেলায় তার চতুর্থ গোল। ম্যান অব দ্য ম্যাচ নেইমার পুরো প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে এই রাতে তুলে নেন গোল্ডেন বুটটিও।
ফ্রেডের দ্বিতীয় মিনিটে দেয়া গোলটিই দৃশ্যত ব্রাজিলকে জয়ের ব্যাপারে বাড়তি আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। একই সাথে তা হতোদ্যম করে দেয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। গোলমুখে সৃষ্ট জটলায় মাটিতে পড়ে গিয়েও বলের উপর নজর রাখা ফ্রেড চকিতে বলটি জালে জড়িয়ে দেন। ফ্রেডের দ্বিতীয় গোলটিও মেলে পরের অর্ধের শুরুর দিকে। এরপর আর ব্রাজিলকে পায় কে। পুরো মাঠজুড়ে চলে তাদের ফুটবল নাচন এবং ক্ষণে ক্ষণেই আরো গোলে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এছাড়াও আছে রেফারি বিয়র্ন কুইপার্সের তরফে দুটি বঞ্চনার ঘটনা। ডাচ এই রেফারি প্রথমার্ধে দুটি ঘটনায় নেইমার ও অস্কারকে গোল করতে উদ্যত হওয়ার সময় র্যামোস ও অ্যালভারো আরবেলোয়ার মারাত্মক ফাউলে লালকার্ডের পরিবর্তে হলুদ দেখিয়ে ব্রাজিলকে দৃশ্যত বঞ্চিত করেন।
ব্রাজিল সাম্প্রতিক সময়ে ফুঁসে ওঠা মানুষদের রাস্তার আন্দোলনের কারণে প্রত্যাশার বাড়তি চাপ ছাড়াই টুর্নামেন্টটিতে এগিয়ে যেতে থাকে। ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ী কোচ স্কোলারি সেবারের মতো কনফেডারেশন কাপেও ধীরে ধীরে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা বের করে নিয়ে আসেন। সবচেয়ে বেশি নেন নেইমারের কাছ থেকে।
