রমজান আত্মশুদ্ধির মহিমায় সমুজ্জ্বল

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:২০
মানুষে মানুষের সাম্য-সংহতি ও ইসলামি জীবনবোধের সৌহার্দ-সৌন্দর্যের অনন্য সম্ভার পবিত্র রমজান। আরবি ‘রময’ শব্দমূল থেকে বিকশিত ‘রমজান’ দহন, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃখাদ-নিঃষ্কলুশ ও বক্রতা-বিকৃতি মুক্ত খাঁটি, পবিত্রকরণের মূলগত ও তাত্পর্যগত অর্থ বহন করে। রমজানের সব ইবাদত, আবেদন, নিবেদন ও সমর্পন মহামূল্যবান। মানুষ এ মাসে আত্মসংযমের মাধ্যমে নিজেকে মহান আল্লাহ্র খাঁটি বান্দা হিসেবে গড়বার সুবর্ণ সুযোগ লাভ করে। রমজানে মু’মিন বান্দার সব তত্পরতা উচ্চ মর্যাদার ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। রমজানে সিয়াম সাধনার তাত্পর্য প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন “ হে বিশ্বাসীগণ তোমাদের জন্য রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে”। সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর এ আয়াতের মূল পাঠ— “কুতিবা আলাইকুম ” এর ইংরেজি ‘Fasting is prescribed to you’ এমন বক্তব্য প্রমান করে রোজার মহিমা, এ তো মহাপ্রভুর লিখিত (prescribed) বিশেষ আদেশ এবং তা অবশ্য পালনীয়। কেননা, আরবি ‘কুতিবা’ শব্দের বাঙ্গলারূপ —‘ লিখে দেওয়া হল ’। আ্তাার সুরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত “তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পায়”এর ইংরেজি ‘ Who is present during that month should spend it in fasting’ এতেই বোঝা যায় এ মাসের সব ইবাদতের মূল্য কত বেশি । আর prescribed, present, should ইত্যাদি শব্দ গুলো বক্তব্যের গাম্ভীর্য ও গভীরতা (ওজন) প্রমান করে। কেননা, রমজানের কোন ইবাদতে শিথিলতা ও সংক্ষিপ্ততা কাম্য নয়। যদিও তারাবীহ্, যাকাত-ফিত্রা ইত্যাদি প্রসঙ্গে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর অপপ্রয়াসে ধর্মভীরু মানুষ মাত্রই উদ্বিগ্ন। রমজানের রোজা ফরজ হওয়া সংক্রান্ত আল-কুরআনের বিধান অবতীর্ণ হয় ৬২৪ খ্রিঃ এর ১৪ শাবান তারিখ। এমাসের শ্রেষ্টতম রজনী ‘লাইলাতুল কদরে’ সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট আসমানী কিতাব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর প্রতি সর্বশ্রেষ্ট স্থান মক্কার হেরা পর্বতের গুহায় অবতীর্ণ হয়। মহান আল্লাহ্ বলেন “মহিমান্বিত রমজান মাস, এতে মানব জাতির পথ প্রদর্শক এবং সত্পথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে” (বাকারা:১৮৫)। এ মাসেই কিন্তু অন্যান্য আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হয়। যথা যাবুর ০৬ রমজান, তাওরাত ০১ রমজান, ইঞ্জিল ১২ রমজান অবতীর্ণ হয়। এজন্যই মহান আল্লাহ্র রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমায় সমুজ্জ্বল মাহে রমজান। ইসলামের অনন্য স্তম্ভ ‘সাওমে’র বহুবচন ‘সিয়াম’ অর্থ বিরত থাকা, থেমে যাওয়া,বর্জন করা ইত্যাদি এবং এরই প্রচলিত বা ফারসি রূপ ‘রোজা’। প্রকৃত সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য হলো— পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে বিমুক্ত হওয়া। খাদ্যাভ্যাসে কৃচ্ছতার মাধ্যমে রোজা মানুষের জৈবিক লালসাকে নিবৃত্ত করে,ফলে আত্মিক বা আধ্যাত্মিক আবেগ অনুভূতি জেগে ওঠে। এভাবেই বান্দা আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মহিমায় সারা বছর পরিশীলিত জীবনবোধের যোগ্যতা অর্জন করে। ‘এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা ’ গ্রন্থে আছে “প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম, এমন কি গ্রীক ও পারসিক ধর্মে উপবাস প্রথা প্রচলিত ছিল... পৃথিবীর এমন কোন ধর্মমত খুঁজে পাওয়া যাবে না যাতে উপবাস রীতির প্রচলন নেই ”। কেনান, ‘ ভোজনে কৃচ্ছ সাধন ’ আবহমান ঐতিহ্যে সব ধর্মে স্বীকৃত। অন্যদিকে চিকিত্সা শাস্ত্রেও রোজাকে রোগ নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায় বলা হয়। রোজার সুযোগে ধুমপান ও অন্যান্য বদঅভ্যাস ত্যাগ করে নিয়মানুবর্তীতার মাধ্যমে স্বস্তিদায়ক দেহ গঠন করা যায় এবং হ্রাস পায় ‘স্থুলতা’ — যা এ্যাজমা, ব্লাডপ্রেসার, ক্যান্সার, ডায়বেটিস্, সংক্ষেপে A.B.C.D এর মত মরণ ব্যাধির জন্য দায়ী। রমজানের অপূর্ব সুযোগে তারাবীহ্ নামাযে রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে মহাপ্রভুর শাহী দরবারে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। জামাআতের সঙ্গে নামাযরত অবস্থায় শুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন শোনার সৌভাগ্য হয় মূলতঃ তারাবীহ্র কারণে। আল-কুরআনে ৫৪০ টি রুকু রয়েছে, ৫৪০২৭=২০ রাকাআত তারাবীহ্র জামাআতে পুরো কুরআন শোনা বা ৩০২০= ৬০০ রাকাআত নামায জামাআতে আদায় কতই না মূল্যবান। সাধারণ ভাবে বলা হয় পবিত্র কুরআনে আয়াত-৬৬৬৬,শব্দ-৭৭৯৪, অক্ষর-৩২৩৭৬০ টি এবং আল্লাহ্ শব্দটি ২৫৮৪ বার যা নামাযে শোনার কারণে বান্দাকে উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয়। কেননা, প্রতি অক্ষর পাঠে দশ নেকী আর তা রমজানের কারণে কী পরিমান বৃদ্ধি পায় তা অননুমেয় এবং মহাকল্যাণ প্রদ। এ মাসেই রয়েছে ‘হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ট রজনী ’ বা লাইলাতুল কদর — যেখানে বার মাসে এক বছর সেখানে ‘হাজার মাস ’ তো সংখ্যার গানিতিক বিশ্লেষণ নয় বরং এর দ্বারা অফূরন্ত ও অসীম, অপরিমেয় সৌভাগ্য বোঝায়। মানুষের আর্থিক সামর্থ্যকে আল্লাহ্র সমীপে নিবেদনের মত মহিমান্বিত ইবাদত ‘যাকাত’ রমজান মাসেই আদায় করা হয়। অন্যদিকে রমজানের অনুসঙ্গ ‘সাদকাতুল ফিতর’। বার্ষিক উত্বৃত্তির প্রতি এক লক্ষ টাকায় দুই হাজার পাঁচশত টাকা হিসেব করে ‘ফরজ দান’ — যাকাত দেওয়া কতই না সৌভাগ্যের বিষয়। আর ১.৭৫ কেজি গম, আটা অথবা ৩.৫ কেজি বার্লি, খেজুর, খোরমা, কিশমিশ, পনির, যে কোন একটি খাদ্যদ্রব্য বা এর সমপরিমান অর্থমূল্য দান করা হলো ‘ফিত্রা’ এবং তা আদায় করা ওয়াজিব। বস্তুতঃ রমজান মাস এক মহিমান্বিত মাস। হাদীসের বিবরণে পাওয়া যায় ‘এমাসে আকাশের দরজা গুলো (রহমত ও বেহেশত) খোলা হয়, দোযখের দরজা বন্ধ রাখা হয় এবং শয়তানকে শিকল বন্দী করা হয় ’(তিরমিযি)। মহান আল্লাহ্র অফুরন্ত নিয়ামতে পরিপূর্ণ রমজানের রোজা পালনকারীদের প্রতি প্রিয়নবীর (সাঃ) সুসংবাদ “ যে ব্যক্তি ঈমান ও আত্মবিশ্লেষণের সঙ্গে রোজা পালন করল ; সে পূর্বকৃত গুনাহ্ মার্জনা করিয়ে নিল ” (বুখারি-মুসলিম)। রোজা পালনে বিরত থাকবার অবকাশ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা আছে “ফামান কানা মিনকুম মারিদান আও আলা সাফারিন...” অর্থাত্ এ অবকাশ প্রধানতঃ দু’শ্রেণির জন্য যথা— মৃত্যু ঝুঁকি ও অতিব বার্ধ্যক্যজনিত জীর্ণ-জ্বরাগ্রস্থ অসুস্থতা এবং অজ্ঞাত গন্তব্যে দূর-দূর্গম বন্ধুর পথ পরিক্রমায় শ্রান্ত-ক্লান্ত পথিক। অর্থাত্ রোগী ও মুসাফির। তবু বলা হয়েছে Who is present during that month should spend it in fasting তাই অফিসে,ব্যবসায়, পরিবারে,সমাজে যিনি present তার কি মহান আল্লাহ্র দরবারে অনুপস্থিতি মানায় নিছক ‘অসুস্থতা’র অজুহাতে? কেননা, সাধারণভাবে সব বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের মতামত রোজা রাখবার পক্ষে।