চট্টগ্রামে বৃষ্টিভেজা ম্যাচে তার যখন অভিষেক হচ্ছিল, প্রেসবক্সে কেউ একজন মজা করে বলছিলেন—বাংলাদেশের মাইক হাসির টেস্ট অভিষেক হচ্ছে!
না, মাইক হাসির মতো দশ হাজারের বেশি প্রথম শ্রেণির রান নিয়ে টেস্ট খেলতে নামেননি ইলিয়াস সানি। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সানি একটু বিরল প্রজাতির অভিষিক্তই ছিলেন। টেস্ট অভিষেকের আগেই নামের পাশে তার দুই হাজারের বেশি প্রথম শ্রেণির রান, প্রায় আড়াইশ প্রথম শ্রেণির উইকেট!
ব্যাট হাতে না হোক, বল হাতে অভিষেকটা হয়েছিল মাইক হাসির চেয়েও নজরকাড়া। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি দুই ফরম্যাটেই ইনিংসে ৫ উইকেটের বেশি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন!
এমন খেলোয়াড়ের ভেতরে কেউ ‘বোলার হাসি’ খোঁজ করলে দোষের কী আছে?
কিন্তু সেই ইলিয়াস সানি দুই বছর পর এখন সবধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই আবার স্কোয়াডে জায়গা খুঁজে ফিরছেন। এই দুই বছরের মধ্যেই শুরুর সেই উড়ন্ত সূচনাকে পেছনে ফেলে সানিকে আবার লড়তে হচ্ছে নিজেকে ফিরে পেতে। কী হল এর মধ্যে? এই প্রশ্নের উত্তর আর কারো কাছে থাকুক আর নাই থাকুক, সানির কাছে আছে।
ছুটির দিনে সবাই যখন তিন সপ্তাহের কঠোর কন্ডিশনিং ক্যাম্পের ক্লান্তি কাটাতে ব্যস্ত; সানি তখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজের সবটুকু অভিজ্ঞতা ঢেলে দিলেন যেন, ‘আসলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খুব কঠিন জায়গা। দূর থেকে একরকম মনে হয়। কিন্তু মাঠে নামলে বোঝা যায়, পারফরম্যান্সটা এখানে ধরে রাখা কতো কঠিন। আমি আসলেই নিজের পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারিনি। আর পারফরম করতে না পারলে দলে জায়গা হবে না, এটাই তো বাস্তবতা!’
সানির এই পরিণত ভাবনাই বলে দেয় ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে কী অভিজ্ঞতা তিনি নিয়ে এসেছেন। দল থেকে বাদ পড়া খেলোয়াড়দের যেমন অনুযোগ-অভিযোগ থাকে; সেসবের কিচ্ছু নেই। সানির কথায় অন্তত নিশ্চিত হওয়া গেল, তার মধ্যে আছে শুধু ফেরার চিন্তা, লড়াইয়ের চিন্তা।
এই লড়াইয়ের চিন্তা করার অভ্যাসটা তিনি ওই ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেই পেয়েছেন। দিনের পর দিন ব্যাটে-বলে পারফরম করেছেন; সেঞ্চুরি করেছেন, ৫-৭ উইকেট নিয়েছেন; জাতীয় দলে ডাক পাননি। তখন মন খারাপ হত। এখন বুঝতে পারেন, আসলেই ওই অভিজ্ঞতাটার দরকার ছিল, ‘হ্যা, তখন মাঝে মাঝে মন খারাপ হত। ভাবতাম, নির্বাচকরা আমাকে অবহেলা করছেন। পরে বুঝেছি, ঠিকই আছে। ঘরোয়া ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা যতো নিয়ে আসবো, ততোই ভালো। আবারও বলি, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট খুব টাফ। আমি হয়তো এখনও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারিনি। কিন্তু ওই যে সময়টা কাটিয়েছি, ওতে আমি অনেক শিখেছি। এখন আবার সুযোগ পেলে হয়তো মানানো সহজ হবে।’
সানি মানিয়ে নিতে পারেননি এটা বলা মুশকিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক ইনিংসেই ৯৪ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি অভিষেকে ১৩ রানে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। এমন অভিষেকের পর আর ৩টি টেস্ট ও ৪টি ওয়ানডে খেলার পরই দলে জায়গা হারিয়ে ফেলায় বরং সানি নিজেকে দুর্ভাগাই ভাবতে পারেন। ভাবতে পারেন, বাঁহাতি স্পিনারের এই ভিড়ের মধ্যে একজন বাঁহাতি স্পিনার হিসাবে জন্মেই বুঝি ভুল করেছেন।
কিন্তু সানি এসব নেতিবাচক চিন্তাই যেন করতে চান না। তার যুক্তি সহজ, ‘হ্যা, বাঁহাতি স্পিনার এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফাইটটাও তাই বেশি। এর মধ্যে সাকিব আর রাজ ভাই তো ওয়ার্ল্ড ক্লাস স্পিনার। তবে পারফরম করতে পারলে এগুলো সমস্যা না। ঘরের মাঠে খেলা হলে তিন বাঁহাতি স্পিনারও তো খেলানো হয়। আমি যদি ভালো করি, কতোজন বাঁহাতি স্পিনার লড়াইয়ে আছে, সেটা বড় ব্যাপার না। বড় ব্যাপার, আমাকে ভালো করে সুযোগ পেতে হবে।’ হ্যা, এই আবার সুযোগের অপেক্ষায় আছেন সানি। সেজন্য কী কী করতে হবে, তাও নিজের কাছে অন্তত পরিষ্কার সানি। প্রথমত তাকে বল হাতে ভালো কিছু করতে হবে। এই ফেরার লড়াইয়ে থাকা অবস্থায় ভালো কিছু মানে কোনো ‘ইমেপ্রাভাইজেশন’ করতে চান না; বোলিংয়ে এখন লক্ষ্য একটাই—নিখুঁত বল করা। আরেকটা লক্ষ্য আছে তার, ব্যাটিংটাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর করে তোলা। আর এই ব্যাটিংটাকেই নিজেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্থায়ী করার অন্যতম হাতিয়ার বলে মনে করছেন ঘরোয়া ক্রিকেটের স্বীকৃত এই অলরাউন্ডার, ‘আমি ডমেস্টিকে অনেক রান করেছি। কিন্তু ইন্টারন্যাশনালে ব্যাটিংটাই সেভাবে করতে পারিনি। আমি এখন নিজে ব্যাটিং নিয়ে অনেক কাজ করছি। সামনে ‘এ’ দলের ট্যুর আছে; ওখানে চান্স পেলে ব্যাট হাতে কার্যকর কিছু করতে চাই। একবার সেটা করতে পারলে লোয়ার অর্ডারে আমি কিছু রান করতে পারলে জাতীয় দলেরও যেমন কাজে লাগবে, আমার জন্যও খুব উপকারী হবে ব্যাপারটা।’ তাহলে আমরা এখন ‘ব্যাটিং অলরাউন্ডার’ সানির ফেরার অপেক্ষায় থাকতে পারি?
