মান্নান এগিয়ে

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৩, ২৩:০৩
সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রথম নগরপিতা হওয়ার পথে এগিয়ে রয়েছেন ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বেসরকারিভাবে ২০৩ কেন্দ্রের ফলাফল জানা গেছে। তার মধ্যে বিএনপির এম এ মান্নান ২৩০১২৭ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী আওয়ামী লীগের আজমত উল্লাহ খান পেয়েছেন ১৮৫৩৯৪। এর ফলে গাজীপুরে আওয়ামী লীগের দুর্গের পতন ঘটিয়ে বিএনপির জয় হলো। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মহলের কাছে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছিল। সেই বিবেচনায় জনরায় বিএনপির দিকেই হেলে পড়েছে বলে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল। চরম উত্তেজনা নিয়ে দেশবাসী অপেক্ষায় ছিল গাজীপুরে কে হতে যাচ্ছেন নগরপিতা। স্থানীয় নির্বাচন কিন্তু তা পরিণত হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মর্যাদার লড়াইয়ে। সে লড়াইয়ে স্পষ্টতই বিএনপি জয়ী হলো। গতকাল শনিবার শান্তিপূর্ণ ও উত্সবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২/১ বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া তেমন কোন গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে একটানা বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে ভোট গ্রহণ। তবে যারা শেষ সময়ে কেন্দ্রের ভিতরে ছিলেন সময়সীমা পেরিয়ে যাবার পরেও তাদের ভোটগ্রহণ করা হয়। এই নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, সন্দেহ, অবিশ্বাস থাকলেও কোথাও বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা থাকলেও তরুণ, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস নিয়ে ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্রের বাইরে কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও কোন কেন্দ্রের ভেতরে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে ক্ষমতসীন দলের স্থানীয় নেতাদের অবাধ যাতয়াত ছিলো কেন্দ্রগুলোতে। এদিকে ক্ষমসীন দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সুষ্ঠুভাবে নির্বচন সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থকে ব্যাপক কারচুপি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়। গতকাল ভোটাররা খুব আগ্রহ নিয়েই ভোটকেন্দ্রে এসেছিলেন। সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই ভোটারদের উপস্থিতি দেখা গেছে ভোটকেন্দ্রগুলোতে। ভোট গ্রহণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায় কেন্দ্রের সামনে। সকালে গাজীপুর শহরের নাওজোড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, চান্দনা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বাইমাইলে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে সকাল সোয়া আটটার সময়। এদিকে, নির্বাচনে শতকরা ৬৫ ভাগ ভোট পড়েছে বলে বিভিন্ন কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারদের সূত্রে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিকাল ৫টা থেকে ভোট গণনা শুরু হয়। কেন্দ্রের আশপাশে মেয়র ও কাউন্সিলরের সমর্থকরা উত্সবের আমেজে ভোট গণনা উপভোগ করেন। সালনা এলাকাটি মান্নানের এলাকা বলে পরিচিত। সেখানে ৫টি কেন্দ্রে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা যায়নি। তবে জয়দেবপুরে নীলের পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে মান্নানের সমর্থকেরা কিছু অভিযোগ তুলে ধরেন। তারা বলেন, সরকার সমর্থক প্রার্থীর পক্ষের লোকেরা অনেকে মিলে শোডাউন করলেও র্যাব ও পুলিশ কিছু বলছে না; কিন্তু মান্নানের সমর্থকদের দাঁড়াতে দিচ্ছে না। নির্বাচন চলাকালে জয়দেবপুর শহরের মধ্যে আজমতউল্লার সমর্থকদের ছোট ছোট মিছিল করতে দেখা গেছে। আর সালনা এলাকায় এম এ মান্নানের সমর্থকদের একই ধরনের মিছিল করতে দেখা গেছে। শহরের বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে প্রচার-প্রচারণা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেয়। নির্বাচনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিতে ৫ হাজার পুলিশ, ১২ প্লাটুন বিজিবি, র্যাবের ৮৪৭ জন সদস্য ও আনসার সদস্যসহ নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ১১ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। সিটি এলাকার ৫৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে একজন করে ৫০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত, ১০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রে গতকাল থেকে নির্বাচনী অপরাধসমূহ সংক্ষিপ্ত বিচার আদালত পরিচালনার জন্য কাজ করেছেন। পুলিশ, এপিবিএন, ব্যাটালিয়ন, আনসার, র্যাব ও বিজিবি সদস্যদের নিয়ে ১৯টি মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স গঠন করা হয়। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মধ্য থেকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য ৩৯২ জনকে প্রিজাইডিং অফিসার, ২ হাজার ৪০৩ জনকে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং ৪ হাজার ৮০৭ জন দায়িত্ব পালন করেন। মান্নান-আজমতের ভোট প্রদানঃ ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. এ মান্নান সকালে তার পারিবারিক গুরুজনদের কবর জিয়ারত শেষে সকাল সাড়ে ৯টার দিয়ে নিজ কেন্দ্র সালনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় ভোট প্রদান করেন। এ সময় তার সাথে বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। ভোট শেষে অধ্যাপক মান্নান সাংবাদিকদের জানান, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিনি বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী এবং নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবেন। ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান টঙ্গীর লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে ভোট প্রদান করেন। ভোট শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছে। তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হবেন। ফলাফল যাই হোক তিনি মেনে নেবেন। বিধি ভঙ্গ করে মিছিলঃ নবগঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন প্রথম নির্বাচনের দিনে গতকাল শনিবার কয়েকটি কেন্দ্রের বাইরে আজমত উল্লা খান ও অধ্যাপক মান্নানের সমর্থকেরা নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গ করে মিছিল করেছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বাধা দেয়নি। গতকাল দুপুরে মহানগরীর সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে আজমত উল্লাহ খান ও অধ্যাপক মান্নানের সমর্থকেরা নিজ নিজ প্রার্থীর প্রতীকের পক্ষে কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি মিছিল করে। এসময় দুই পক্ষে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে; কিন্তু কারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এছাড়া আজমত উল্লাহ খানের সমর্থকরা টঙ্গীর কয়েকটি কেন্দ্রের বাইরে এবং মহানগরীর বিভিন্ন সড়কে দোয়াত-কলমের পক্ষে মিছিল করেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা যা বলেনঃ রিটার্নিং কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম বলে উল্লেখ করেন তিনি। দোকান-পাট বন্ধ, সড়কগুলো ফাঁকাঃ নির্বাচন উপলক্ষে মহানগরীতে গতকাল শনিবার ছিল সাধারণ ছুটি। তাই সরকারি অফিস-আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কল-কারখানা বন্ধ থাকে। একারণে মহানগরীর সকল বিপণী বিতান, দোকান-পাট বন্ধ ছিল। মহাসড়ক ব্যতীত অন্যান্য সড়ক ও রাস্তা ছিল ফাঁকা।