অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিকে মানতে পারছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাই তিনি আলোচনার মধ্যেই চীনা পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে চলছেন। বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমলেও মার্কিনীদেরই শুল্কের বোঝা যেমন বহন করতে হবে। আমদানি কমায় চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকে আঘাত হানছে। দুই পরাশক্তির এই লড়াই স্বাভাবিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্য যুদ্ধ ক্রমেই অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে এবং দীর্ঘদিন ধরে চললে বিশ্ব অর্থনীতিকে ভুগতে হবে।
শুল্কের খড়গ: যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে ওয়াশিংটনে বাণিজ্য যু্্্দ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা চলছিল। সাতটি অধ্যায়ে ১৫০ পৃষ্ঠার একটি খসড়াও তৈরি হয়েছিল। কোনো চুক্তি ছাড়াই শুক্রবার আলোচনা শেষ হয়েছে। এর আগেই শুক্রবার সকালে ট্রাম্প চীনের ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ ভাগ করেন। মার্কিন পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে আমদানি করে প্রায় ৫৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। চীনের মোট ২৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে ২৫ ভাগ শুল্ক বসিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ২৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। বাকি আছে ২৯০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যদিও ট্রাম্প আরো ৩২৫ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্যে ২৫ ভাগ শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি ৪২০ বিলিয়ন ডলার। ১৯৮৫ সাল থেকে ঘাটতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে মার্কিন অর্থনীতিকে। তবে ‘ব্যবসায়ী ট্রাম্প’ ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই ঘাটতি নিরসনের কথা বলে আসছেন।
যেসব পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে: আগের মার্কিন শুল্ক মাছ, হাতব্যাগ, পোশাক এবং ফুটওয়্যারের ওপর প্রভাব ফেলেছে। নতুন শুল্ক বৃদ্ধি চীনের যোগাযোগ সংক্রান্ত যন্ত্রাদি (১৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি), কম্পিউটার সার্কিট বোর্ডস (১২ দশমিক ৫), প্রসেসিং ইউনিট (৫ দশমিক ৬), ধাতব পদার্থের ফার্নিচার (৪ দশমিক ১), কম্পিউটার পার্টস (৩ দশমিক ১), কাঠের ফার্নিচার (২ দশমিক ৯), পাওয়ার কনভার্টার্স (২ দশমিক ৭), ভিনিল টাইলস ফ্লোর কভারিংস (২ দশমিক ৫), কাঠের সোফা (২ দশমিক ৫) এবং গাড়ির যন্ত্রাংশের (২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার) রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে।
চীন কী করতে পারে: মার্কিন পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনে রপ্তানি করেছে ১২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। চীন পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের ১১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক আরোপ করেছে। সেক্ষেত্রে আর মাত্র দশ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক আরোপ করতে পারবে বেইজিং। এত কম পণ্যে শুল্ক বৃদ্ধি হয়তো চীনের জন্য ততোটা সুবিধা বয়ে নাও আনতে পারে। তবে মার্কিন কোম্পানির জন্য ব্যবসাকে কঠিন করে তুলতে পারে। সীমান্তে কাস্টমস বিভাগ মার্কিন কোম্পানির পণ্যের ছাড়ের ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটানো এবং যাচাই-বাছাই আরো কঠোর করতে পারে। বিশেষ করে বোয়িং, নাইক, তেসলা, জেনারেল মোটরস এবং ইনটেলসহ অনেক কোম্পানিই পণ্য বিক্রির জন্য চীনের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। চীনের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জুলিয়ান ইভান প্রিতচার্ডের মতে, সেক্ষেত্রে চীনও সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ দেশটি সম্প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজার উন্মুক্ত করার কথা বলেছে। ফলে বিনিয়োগও আসছে। এখন বিদেশি কোম্পানির ওপর কড়া নজরদারি চালালে বেইজিংয়ের সেই নীতিতে আঘাত আসবে।
দুই দেশেরই ক্ষতি: ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের কোম্পানিগুলোর ওপর বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে আমেরিকার কৃষকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বেশি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আয় কমে যাওয়ার জন্য বাণিজ্য যুদ্ধের ওপর দোষ চাপিয়েছে প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান অ্যাপল। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ক্যাটারপিলার জানিয়েছে, এই যুদ্ধে তাদের ২১০৮ সালে ১০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। চীনের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান আলিবাবাও এই লড়াইয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছে। অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনেরই বেশি ক্ষতি হবে। আইএমএফের মতে, চলতি বছরে চীনের জিডিপি ১ দশমিক ৬ ভাগ পড়ে যেতে পারে। প্রথম চার মাসে মার্কিন অর্থনীতিতে ৩ দশমিক ২ ভাগ উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। বেকারত্বের হারও গত ৫০ বছরে সর্বনিম্নে। ইকোনোমিক পলিসি ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই স্কটের মতে, বর্তমান অর্থনীতির ক্ষতির সূচক মার্কিন অর্থনীতির (প্রথম চার মাসে জিডিপি ২১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার) জন্য বড় কিছু নয়। কিন্তু চীনের জন্য বড়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা ৫৪০ বিলিয়ন ডলার বেইজিংয়ের ১৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির চার ভাগ।
বিশ্ব অর্থনীতিতে কিভাবে প্রভাব ফেলবে: ফরাসি অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লে মায়ার বলেছেন, বিশ্ব প্রবৃদ্ধির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে চলা বাণিজ্য যুদ্ধের চেয়ে খারাপ কিছু আর নেই। ইউরোপের আমদানি-রপ্তানিতেও এই যুদ্ধ প্রভাব ফেলছে। ইউরোপের কর্মসংস্থানের বাজারে সবচেয়ে বেশি আঘাত হানবে বলে মনে করেন লে মায়ার। আর্থিক বাজারে দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করে। গত বছর এই লড়াই শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিচ্ছে এবং তারা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। গত রবিবার ট্রাম্পের টুইটের পরই চীনের শেয়ারবাজারে ৪ ভাগ পতন ঘটে। যদিও শুক্রবার কিছুটা বাড়ে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর মার্কিন শেয়ারবাজারেও দরপতন হয়। তবে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রীর আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণার পর সূচক কিছুটা বাড়ে। ২০১৮ সালে হংকংয়ের হ্যাং সেংয়ের সূচক ১৩ ভাগ এবং সাংহাই কম্পোজিটের ২৫ ভাগ পড়ে। জেপি মরগ্যান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বাজার বিশ্লেষক হান্না অ্যান্ডারসনের মতে, বিশ্ববাজার পরিস্থিতি কোনিদকে যায় তার ওপর নির্ভর করবে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হবে কিনা। না হলে বিশ্ব অর্থনীতির সেটা অশনিসংকেত হবে বলে মনে করেন সিএনএনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ঋষি ইভেনগার।
