অলক বিশ্বাস
গত বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আর অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে বছরের শুরু থেকেই অশান্ত হয়ে ওঠে ভেনিজুয়েলা। বিক্ষোভের মধ্যে জানুয়ারিতে বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুইদো নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণার পর থেকে দেশটিতে ‘তুরুপের তাস’ হয়ে উঠেছে সেনাবাহিনী। বেশ কয়েক জন সামরিক সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে গুইদো সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। উল্টো ভেনিজুয়েলার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে রাজধানী কারাকাসের রাজপথে হেঁটে তার প্রতি সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রমাণ করেছেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন লাভের পর এখন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী দলকে দমনের নীতি গ্রহণ করেছেন মাদুরো। মাদুরো সরকারের দমন নীতির মুখে বিরোধী দলের আইন প্রণেতারা এখন বিদেশি দূতাবাসগুলোতে আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন।
মাদুরোপন্থি গণপরিষদ এদগার জামব্রানোসহ আরো ছয় জন আইনপ্রণেতাকে ভবিষ্যতে বিচারের মুখোমুখি করতে তাদের কাছ থেকে সংসদীয় দায়মুক্তি প্রত্যাহারে সম্মত হয়। এর আগে ওই আইনপ্রণেতাদের ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত করে সুপ্রিম কোর্ট। একই অভিযোগে বিরোধী দলের আরো তিন আইনপ্রণেতাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিরোধী দলের মোট ১০ জন আইন প্রণেতাকে ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
ইতোমধ্যে বিরোধী দলীয় নেতা হুয়ান গুইদোর কংগ্রেসনাল ডেপুটি এদগার জামব্রানোকে আটক করেছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা সেবিন-এর সদস্যরা। বুধবার নিজের গাড়ির ভেতরে বসা থাকা অবস্থাতেই তাকে আটক করে গোয়েন্দা সংস্থা। একটি ক্রেনের সাহায্যে তার গাড়িটিকে টানতে টানতে গোয়েন্দা সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ এবং বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে সুপ্রিম কোর্ট জামব্রানোকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। তাকে আটকের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাকে মুক্তি না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে গত শুক্রবার ভেনিজুয়েলার দুইটি শিপিং কোম্পানি এবং ভেনিজুয়েলার সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্ত দুইটি ট্যাংকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
গোয়েন্দা সংস্থা জামব্রানোকে আটকের পর বিরোধী দলের দুই আইন প্রণেতা এমেরিকো দে গ্রাজিয়া এবং মারিয়েলা মেগালেন্স ইতালির দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মারিয়েলা মেগালেন্স একজন ইতালিয়ানকে বিবাহ করেছেন এবং ইতালির নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন। ইতালির দূতাবাসের তরফ থেকে মারিয়েলাকে নিরাপত্তা এবং আতিথেয়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্য একজন আইন প্রণেতা রিচার্ড ব্লাঙ্কো আর্জেন্টিনার দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া গ্রেফতার এড়াতে স্পেনের দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন বিরোধী দলের আইন প্রণেতা লিওপোলদো লোপেজ। যদিও স্পেনের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রী জোসেফ বোরেল বলেছেন, তার দেশ রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে তাদের দূতাবাসকে ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।
ভেনিজুয়েলায় চলমান অস্থিরতায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়ার পর তার জবাব দিয়েছেন মাদুরো। মার্কিন আগ্রাসন মোকাবিলায় নিজ দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন ভেনিজুয়েলার মাদুরো। টুইটার পোস্টে মাদুরো বলেন, আমাদের এমন একটি সামরিক বাহিনী রয়েছে, যা দেশরক্ষা ও শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম। এই সেনাবাহিনী সব সময় বিশ্বস্ত ভূমিকা পালন করে এবং কখনোই বিশ্বাসঘাতক হয় না। ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী দেশের জনগণ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিরোধী শিবিরের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা নস্যত্ করতে সামরিক বাহিনীর প্রতি অগাধ আস্থারও বহিঃপ্রকাশ ঘটান। অন্যদিকে বিরোধী দলের আইন প্রণেতাদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হওয়ার পর গুইদো নতুন করে রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা কতটুকু কার্যকর হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
