আমাদের দেশে খাদ্যের মান ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিয়ে বিগত সরকারগুলোর তেমন মাথাব্যথা লক্ষ্য করা যায়নি। মাঝে-মধ্যে খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল মেশানোর অপরাধে কিছু শাস্তি দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। বিগত সরকারের আমলে খাদ্যে ভেজালের মাত্রা এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো ও গণমাধ্যমের তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার কিছু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা শুরু করে। মোবাইল কোর্টগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে ভেজালের জন্য দায়ী কারখানা মালিক ও বিক্রেতাদেরকে শাস্তি প্রদান শুরু করে, যা জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন করে। এ সমর্থন ছিল দলমত নির্বিশেষে।
দেশবাসীর মতো আমরাও চাই মোবাইল কোর্ট অব্যাহতভাবে অভিযান পরিচালনা করুক। সরকারকে এবং মোবাইল কোর্টসমূহের ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদেরকে আমরা এজন্য অভিনন্দন জানাই। এসব মোবাইল কোর্টের সঙ্গে পৌর করপোরেশন, বিএসটিআই, মত্স্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ আরো বিভিন্ন সরকারি সংস্থাসমূহের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত থাকেন। এছাড়া পুলিশ, বিডিআর, সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়। আমরা বুঝতে পারি এসব অভিযান অত্যন্ত জটিল ও কষ্টকর। তাদের সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া এসব অভিযান সফল হতো না। কিন্তু যতই কষ্টকর হোক, দেশ ও জাতির স্বার্থেই এ অভিযান আরো ব্যাপকভাবে পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। নইলে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম তো বটেই, আমাদের আগামী প্রজন্মগুলোও স্বাস্থ্য ও আয়ুগতভাবে সীমাহীন দুর্দশায় পতিত হবে।
মোবাইল কোর্ট খাবারে ক্ষতিকর রং বা অন্যান্য রাসায়নিক আছে কিনা, খাদ্যসামগ্রী স্বাস্থ্যসম্মতভাবে উত্পাদন ও বিক্রি হয় কিনা, ফল রাসায়নিক দিয়ে পাকানো কিনা, ফলে ও মাছে ফর্মালিন দেওয়া হয়েছে কিনা ইত্যাদি সবই পরীক্ষা করে দেখছেন। এসব কাজের ফলে অন্তত ঢাকা মহানগরীতে খাদ্যদ্রব্যে ক্ষতিকর রঙ ব্যবহারের মাত্রা কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে ফল এখনো রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হচ্ছে। আপেল-আঙ্গুর-নাশপাতি প্রায় সবই এখনো ফর্মালিনে চুবিয়ে বিক্রি করা হয় বলে এক সপ্তাহেও পচে না। বলা যায় ফলের বাজারে মোবাইল কোর্টের ইতিবাচক প্রভাব এখনো তেমন পড়েনি। তবে খাদ্য তৈরির কারখানা ও হোটেল রেস্টুরেন্টগুলোর অবস্থা কিছুটা উন্নত হয়েছে। মাছের বাজারে ফর্মালিনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযান চালানোর পর এখন অবস্থার খানিকটা উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়। অর্থাত্ সার্বিকভাবে মোবাইল কোর্টের সুফল আমরা কিছূটা হলেও পেতে শুরু করেছি। আশা করা যায় এভাবে অভিযানগুলো চলতে থাকলে কিছুদিন পর আমাদের খাদ্যের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বা অনিরাপত্তার বিষয়টি বেশ সহনীয় মাত্রায় চলে আসবে।
মোবাইল কোর্টগুলোর অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালনা করার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি। বিগত সরকারের আমলের অনিয়মিত অভিযানকে লোকদেখানো বলে অনেকেই অভিহিত করেছিলেন। কারণ একবার কোনো অসত্ ব্যবসায়ীকে জেল-জরিমানা প্রদানের কিছুদিন পর পুনরায় একই লোককে একই অপরাধে লিপ্ত হয়ে সাজা পেতে আমরা দেখেছি। সরকারের আইনী দুর্বলতা অসীম, কারণ বিগত কোনো সরকারই এবিষয়ে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের খাদ্য আইন অনুযায়ী জেলায় জেলায় আলাদা খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাত্ খাদ্য অপরাধের জন্য এখন আর মামলা-জটে পড়তে হবে না, ফলে দ্রুত বিচার করা সম্ভব হবে, বিশেষায়িত আদালত হওয়ার ফলে সঠিক বিচারও নিশ্চিত করা যাবে। মোবাইল কোর্ট নিয়মিতভাবে পরিচালনা করলে এবং এসব আদালত সক্রিয় হলে অবস্থা উন্নত হতে বাধ্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঢাকার বাইরে মোবাইল কোর্টের তত্পরতা তেমন দেখা যাচ্ছে না। বেশ কিছুদিন আগে দুয়েকটি বিভাগীয় শহরে একটি-দুইটি মোবাইল কোর্টের দেখা মিললেও বর্তমানে তত্পরতা কমে গেছে। গ্রাম-গঞ্জের কথা না হয় নাই বললাম, ঢাকার সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর জনসংখ্যাকে যোগ দিলেও তা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০% হবে। মোবাইল কোর্ট নিয়মিতভাবেও যদি এসব শহরে পরিচালিত হয় তাহলেও দেশের ৯০% মানুষ মোবাইল কোর্টলব্ধ সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে। ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্য যদি শহরের লোককে ক্ষতিগ্রস্ত করে তবে তা অবশ্যই গ্রামের মানুষকেও করে। শুধু শহরের ভদ্রলোক ও শাসকশ্রেণির জন্যই মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে তা কাম্য হতে পারে না। আমাদের গণমাধ্যমগুলো থেকে আমরা জানি, অসত্ ব্যবসায়ীদের কারণে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যে গ্রাম ও শহর নির্বিশেষে সারা দেশ সয়লাব হয়ে গেছে। সেখানে শুধু শহরের লোকজন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে, গ্রামের লোকগুলো থেকে যাবে একেবারেই অরক্ষিত তা হতে পারে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি, গ্রামগুলোর অবস্থা শহরাঞ্চলের চাইতে শোচনীয়।
শুধু খাদ্যই নয়, অনেক ওষুধ প্রস্তুতকারক পর্যন্ত তাদের নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির জন্য শহর এলাকা বাদ দিয়ে এখন গ্রামাঞ্চলকে বেছে নিয়েছে। তাদের এসব নিম্নমানের ওষুধ শহরে পাওয়া যায় না। অবশ্য সেই সঙ্গে একথাও ঠিক যে জনগণের সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। মানুষ যদি সচেতন না হয়, তাহলে সরকারের পক্ষে কত ভ্রাম্যমান আদালত চালানো সম্ভব? প্রতি ঘরের দরোজায় তো আর মোবাইল কোর্ট পাঠানো সম্ভব নয়।
তবে হ্যা, ম্যাজিস্ট্রেটদের সংখ্যাল্পতা রয়েছে। ঘরে ঘরে না হলেও অন্তত উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট থাকাটা এখন বাঞ্ছনীয়। তাই বলছি, সারাদেশে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গেলে আরো ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন হবে। আমাদের একটি নিয়মিত, স্থায়ী ও উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত মোবাইল কোর্ট অবকাঠামো অবিলম্বে গড়ে তোলা প্রয়োজন এবং সেজন্য ম্যাজিস্ট্রেট পদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিয়োগ যত দ্রুত সম্ভব দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আমাদের প্রত্যাশা সরকার এই জাতীয় জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়টিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কারণ দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জীবনের নিরাপত্তার মতো খাদ্যের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার বিষয়টিও জাতির জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়।
n লেখক:অধ্যাপক, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
