অনুপ্রেরণার অপর নাম বারতোলি

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৩, ২২:১৬
প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা জয়ের জন্য মহিলা টেনিসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক টুর্নামেন্টে অংশ নেয়ার পর অবশেষে ধরা দিল সাফল্য। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসয়ের মূর্ত প্রতীকে পরিণত হওয়া মারিয়ন বারতোলি গত শনিবার জিতলেন উইম্বলডন। আর টেনিস কিংবদন্তীরা বলছেন জয়ের জন্য যে একাগ্রতা এবং নিষ্ঠা বারতোলি দেখিয়েছেন তাতে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার এক নাম হয়েই থাকবেন। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তাকে নিয়ে বাজি ধরার লোকই হয়তো খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে মারিয়া শারাপোভা-সেরেনা উইলিয়ামসরা বিদায় নিতে থাকলে শেষ চারে এসে লড়াইটা হয়ে যায় অনেকটা উন্মুক্ত। সেমিফাইনালের লড়াইয়ে নামেন এমন চার জন যাদের কারোরই ছিল না গ্র্যান্ডস্ল্যাম জয়ের অভিজ্ঞতা। কিন্তু তখনও পাল্লা ভারি ছিল অগনেইস্কা রাদওয়ানস্কা আর পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা স্যাবাইন লিসিকির দিকে। সবাই হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন পুরো টুর্নামেন্টে একটা সেটও না হারা ফ্রান্সের বারতোলির কথা। কিন্তু ফাইনালের আগে বারতোলি নিজেই ঘোষণা দেন, এবারের আসরের ফাইনালে খেলাটা তার প্রাপ্যই। স্মরণ করিয়ে দেন কষ্টের সেই দিনগুলোর কথা। কোর্ট আর কোর্টের বাইরের হাজারো ঝামেলা সামলে যখন একটা মাত্র স্বপ্নকে ধারণ করে তিনি অনুশীলন করেছেন দিনের পর দিন, ‘আপনি কখনোই শুধু উপরের দিকে উঠতে পারবেন না। একজন খেলোয়াড় হিসেবে এটা আপনাকে বিশ্বাস করতেই হবে। আর খারাপ সময়টাকেও আপনার উপভোগ করতে হবে। আমার তেমন বাজে কিছু সময় গেছে। যার মধ্যে কোর্টের বাইরের বিষয়গুলোই ছিল বেশী। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে প্রতিদিন একই মানসিকতা ধরে রাখা, অনুশীলন করা, জিমে ঘাম ঝরানো; এগুলো সত্যিই কঠিন। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে যে, এগুলোই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমার মনে হয় এটা (ফাইনাল) আমার প্রাপ্যই ছিল।’ তার সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো। লিসিকিকে ৬-১, ৬-৪ গেমে হারিয়ে অল ইংল্যান্ড ক্লাবে পেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপার স্বাদ। তবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হলো ৪৭টি গ্র্যান্ডস্ল্যাম টুর্নামেন্ট! যা কিনা টুর্নামেন্টের বিচারে কোন নারী খেলোয়াড়ের জন্য সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার রেকর্ড। এই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ রেকর্ডটি এতদিন ছিল ইয়ানা নাভোতনার দখলে। ৪৫টি টুর্নামেন্ট অপেক্ষার পর নাভোতনা ১৯৯৮ সালে জেতেন তার প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা। সেটিও ছিল এই উইম্বল্ডনেই। জয়ের পর ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংলিশ উচ্চারণে টুর্নামেন্টের পঞ্চদশ বাছাই বারতোলি আবারো নিজের সেই স্বপ্নের বিষয়টিই পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘আমার সুন্দরতম স্বপ্নটিতেও বোধহয় এরকম সুন্দর একটা মুহূর্ত ধরা পড়েনি। আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি অদ্ভুত সুন্দর একটা ম্যাচ খেলেছি।’ নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সবকিছু উজাড় করে দিতে বারতোলির এই গল্প বিশ্বের লাখো-কোটি মানুষকেও অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন বরিস বেকার-লিন্ডসে ডেভেনপোর্টের মতো সাবেকরা। তিনবারের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন বেকার বলেন, ‘একজনের জন্মই হয়েছে টেনিস খেলার জন্য, এটা দেখতে আসলেই দারুণ লাগে। সে হয়তো প্রকৃতপ্রদত্তভাবে সবচেয়ে সহজাত অ্যাথলেট নয়। কিন্তু সে র্যাকেটটাকে তুলির মতো চালিয়ে নিজেকে পিকাসোর জায়গায় তুলে নিতে পারে। এটা আসলেই অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য। যারা কোন কিছু করতে চায় তাদেরকে সে (বারতোলি) অবশ্যই অনুপ্রাণিত করবে। কারণ, (সে প্রমাণ করেছে) কোন কিছুই অসম্ভব নয়।’ অন্যদিকে ’৯৯ সালের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন ডেভেনপোর্ট বলেন, ‘মারিয়ন বারতোলি প্রমাণ করেছেন, আপনি যদি ভিন্নভাবে খেলেন তাতে হয়তো কিছু মানুষ আপনাকে উপহাস করবে। কিন্তু চাইলে তারপরও আপনি একজন চ্যাম্পিয়ন হতে পারবেন। যেই মুহূর্তে সে ভেনাস রোজওয়াটার ডিশটা (চ্যাম্পিয়নের পুরস্কার) তুলে ধরেছে, সেই মুহূর্তটার জন্য সে সারা জীবন ধরে পরিশ্রম করেছে। আপনি হয়তো লিসিকির চোখে কষ্ট আর হতাশা দেখতে পাবেন। তবে সত্য কথাটা হচ্ছে, সে তার সেরা খেলাটা খেলতে পারেনি।’