আর কোনো ব্যাংক যেন ফারমার্স ব্যাংকের মতো বিপদে না পড়ে সে দিকে বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে আরো সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের এমওইউ (সমঝোতা স্মারক চুক্তি) পর্যালোচনা বৈঠকে তিনি এ পরামর্শ দেন। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে পর্যালোচনা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান, আহমেদ জামাল, সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম, জনতা ব্যাংকের এমডি আব্দুছ ছালাম আজাদ, রূপালী ব্যাংকের এমডি আতাউর রহমান প্রধান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পর্যবেক্ষক মাসুম কামাল ভূঁইয়া, আব্দুর রহিম, আজিজুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম ও রবিউল হাসান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, বেশির ভাগ ব্যাংকে বিভিন্ন সূচকের উন্নতি হয়েছে। তবে কম সুদে ঋণ দেওয়ায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা কম হয়েছে। এছাড়া আমানতে সুদের হার কম থাকায় স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। বৈঠকে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এমডিদের আরো সতর্ক থাকার পাশাপাশি আর্থিক বিভিন্ন সূচকে উন্নতি করার তাগিদ দেন গভর্নর। এমওইউ পর্যালোচনা প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১৪ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ১৮ শতাংশ কমে তা ১২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ২০১৭ সালে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল সাত হাজার ৬০০ কোটি টাকা ১৩৭ শতাংশ বেড়ে তা ১৭ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ২৬ শতাংশ বেড়ে তা ছয় হাজার ৯৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল চার হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে তিন শতাংশ কমে তা চার হাজার ৪২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গতকাল ২০১৮ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে এ বৈঠক হয়।
২০১৮ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত এই চার ব্যাংকের তিনটিই প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের তিন হাজার ৮৮ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৫৯৩ কোটি ও রূপালী ব্যাংকের ৮৩৪ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে এ সময়ে জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে ছিল। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের পাঁচ হাজার ৮৫৩ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকের ৮৮৩ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে। বৈঠক সূত্র মতে, ২০১৮ সালে শীর্ষ ২০ খেলাপিদের কাছ থেকে নগদ আদায় পরিস্থিতিও সন্তোষজনক ছিল না ব্যাংকগুলোর। এ সময়ে সোনালী ১১৯ কোটি, জনতা ৯৯ কোটি, অগ্রণী এক কোটি ৭৪ লাখ ও রূপালী পাঁচ কোটি টাকা নগদ আদায় করেছে। অন্যান্য খেলাপিদের থেকে সোনালী ৮৮৮ কোটি, জনতা ৩৮৪ কোটি, অগ্রণী ৩১৭ কোটি ও রূপালী ১৮০ কোটি টাকা আদায় করে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ২৩ শতাংশ ছিল রূপালী ব্যাংকের। এছাড়া অগ্রণীর ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, সোনালীর চার দশমিক ৮১ শতাংশ ও জনতার চার দশমিক ০২ শতাংশ আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়। অন্যদিকে, গতবছর সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ ঋণের প্রবৃদ্ধি হয় অগ্রণী ব্যাংকের। এছাড়া জনতার ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ, রূপালীর ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ ও সোনালীর ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৮ সালে পরিচালন ব্যয় প্রায় একই ছিল রূপালী ব্যাংকের, ৭৭০ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ১০৬ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় ২৮ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। তবে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫২ কোটি টাকা কমে হয়েছে এক হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২০১৮ সালে সোনালী ও রূপালী নিট মুনাফা অর্জনে সক্ষম হলেও লোকসানে ছিল জনতা ও অগ্রণী। তবে গতবছর লোকসানি শাখা কমে এসেছে সব ব্যাংকেরই। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে রূপালীর লোকসানি শাখার সংখ্যা ছিল ৩৩টি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র আটটি। ২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১৮১টি থাকলেও ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে নেমে এসেছে ৯৩টিতে। অগ্রণী ব্যাংকের ২০১৭ সালে ছিল ৪৩টি, তা ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েছে ২১টি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের শাখা ৫৭টি থাকলেও এক বছরের ব্যবধানে ২০১৮ সালে মাত্র একটি কমে দাঁড়িয়েছে ৫৬টিতে।
