রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আনীত সর্বশেষ সংশোধনী জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে মত দিয়েছেন দেশের শীর্ষ দুই আইনজীবী। তারা বলেছেন, এ সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। আইনে যে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়েছে তা বৈধ। সরকারের আপিল করার এখতিয়ার রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে অ্যামিকাসকিউরি হিসেবে সাবেক এটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম এ মত দেন। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ প্রশ্নে তারা দুই ধরনের মত দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সভাপতিত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে তারা এ মত ব্যক্ত করেন। আমীর-উল ইসলাম শুনানিতে অংশ নিলেও ব্যারিস্টার রফিক লিখিত বক্তব্য আদালতে পাঠিয়ে দেন। তার পক্ষে এ বক্তব্য পড়ে শোনান এডভোকেট মৌলভী ওয়াহেদ উল্লাহ।
লিখিত বক্তব্যে ব্যারিস্টার রফিক বলেন, বাংলাদেশের বিচারের ক্ষেত্রে অথবা ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের ক্ষেত্রে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’) প্রয়োগের কোন সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের ২১ ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট এ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। তিনি বলেন, সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদে এ আইনটিকে সুরক্ষা দেয়া আছে। যে কারণে এ আইনের কোন বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও তা বাতিল বলে ঘোষণার সুযোগ নেই।
শুনানিতে আইনের সংশোধনী প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার আমীর বলেন, আপিলের সমানাধিকার নিশ্চিতের জন্য আইন সংশোধন করা হয়েছে। সংবিধান অনুসারে বিচারে সমান সুযোগ থাকতে হবে। এতে আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি। তাছাড়া আইনের সংশোধনের মাধ্যমে সাজার মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়নি। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের আইনের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত প্রণীত সকল প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য। কারণ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সকল ধরনের আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অনুগত। আইনটি যখন করা হয় তখন তা করা হয়েছিল সে সময়কার সব আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সমন্বয় করে। এরপর আন্তর্জাতিক আইনের অনেক ডেভলপমেন্ট হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রাইব্যুনাল কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের যে ডেভলপমেন্ট হয়েছে তাও বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। জেনেভা কনভেনশনে সব আন্তর্জাতিক আইনকেই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অনুগত থাকার কথা বলা হয়েছে। আমাদের সংবিধানেও প্রথাকে আইনের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। এ রায়ের পর কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হয়। এরপর সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী আনে। সংশোধনীতে ট্রাইব্যুনালের যে কোন রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানিতে এই সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিনা সেই বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে আসামিপক্ষ। এই বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ শেষে শীর্ষ আইনজীবী টিএইচ খান, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, এডভোকেট মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ও এডভোকেট এএফ হাসান আরিফকে অ্যামিকাসকিউরি হিসেবে গত ২০ জুন নিয়োগ দেয় আপিল বিভাগ।
