মুড়ির গ্রাম তিমিরকাঠী

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৩, ২২:৩৯
রমজান মাস এলেই মহাব্যস্ত হয়ে ওঠে নগর সংলগ্ন তিমিরকাঠী গ্রামের মানুষ। এ গ্রামের বলতে গেলে প্রায় একশ ভাগ পরিবারই মুড়ি ভাজা ও তা বিক্রির সাথে যুক্ত। যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় তারা ধরে রেখেছেন এ পেশা। সারা বছর এ কাজেই তাদের সংসার চলে। রমজান মাস এলে কাজের চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেই মুড়ি ভাজার কাজে সহায়তা করতে এ সময়টায় যুক্ত হয়ে পড়েন। রমজানের আগে ভাগেই মুড়ি ভেজে মজুদ করা ও পাইকারের কাছে বিক্রি করে বাড়তি উপার্জন করতেই তারা ব্যস্ত। নগর সংলগ্ন আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু পার হয়ে দপদপিয়া ইউনিয়নের এ গ্রামটিতে গিয়ে গতকাল বুধবার দেখা গেছে সকলেই মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত। মাটির হাঁড়ি-পাতিলের টুং-টাং শব্দ। মুড়ি ভাজার পর তা বস্তাভর্তি করা হচ্ছে। হাতে ভাজা এ মুড়ি শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয় সারাদেশের রোজাদারদের কাছে ইফতারির প্রধান রসদ। তিমিরকাঠী গ্রামের দেড়শ পরিবারের অধিক মুড়ি ভাজা পেশার সাথে জড়িত বলে গ্রামের লোকজন জানায়। একেকটি পরিবার প্রতিদিন কমপক্ষে ১ মণ চালের মুড়ি ভাজতে পারে। গ্রামবাসীরা জানায়, রমজান মাসে দৈনিক হাজার মণ মুড়ি এ গ্রাম থেকে পাইকাররা সরবরাহ করে। ইউরিয়া সারের ব্যবহারবিহীন, হাতে ভাজা এ মুড়ি স্বাদে অতুলনীয়। তাই দিনে দিনে মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে এ মুড়ি। পাইকাররা জানায়, দেখতে ধবধবে সাদা যেসব মুড়ি বাজারে পাওয়া যায় তা মেশিনে রাসায়নিক কেমিক্যাল ব্যবহার ও ইউরিয়া সার যুক্ত করে তৈরি করা হয়। এসব মুড়ি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় তিমিরকাঠীর মুড়ির চাহিদা বেশি। বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স নামের একটি মুড়ির আড়তের মালিক জানান, এক সময় দেশের অন্য দশটা গ্রামের মতই এ গ্রামের গৃহস্থরা নিজেদের পরিবারের চাহিদা মোতাবেক মুড়ি ভাজতেন। ১৯৪৮ সালে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ঝুরকাঠির বাসিন্দা আমজেদ মুড়ি ভেজে তা বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেন। তার দেখাদেখি তিমিরকাঠীর আরো কয়েকটি পরিবার তাদের সংসারের আয় বাড়াতে মুড়ি ভেজে বিক্রি শুরু করে। ১৯৮০’র দশকে আ. হক নামে এক বিএসসি শিক্ষক বিভিন্ন স্থানের পাইকারদের মুড়ি ক্রয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করে এ গ্রামে নিয়ে আসেন। এরপরই কদর বাড়তে থাকে তিমিরকাঠীর মুড়ির। স্থানীয়রা জানায়, মুড়ির জন্য উপযোগী বিশেষ তিনটি প্রজাতির ধান ফলে দপদপিয়া ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকাতে। বিশেষ করে এখানে মোটা, নখুচি ও সাদামোটা নামের তিন প্রজাতির ধানের ব্যাপক ফলন হয়। আগে শুধু বউরি ধানের মুড়ির প্রচলন থাকলেও এখন তারচেয়েও সরস ধান হিসেবে নখুচি ধানের মুড়ির কদর বেড়েছে। এছাড়াও দিনাজপুর থেকে নাম্বার-১৬ এবং ভারতের নলটি ধান ক্রয় করে গ্রামবাসীরা মুড়ি তৈরি করেন। বিগত তিন যুগ ধরে এ গ্রামের ভুঁইয়া বাড়ির ৪০টি ঘরের সবাই মুড়ি ভাজার পেশায় নিয়োজিত। তবে এখন আর শুধু ভুঁইয়া বাড়ি নয়, এ গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরের মানুষই গত একমাস ধরে দিন-রাত ব্যস্ত মুড়ি ভাজার কাজে। দৈনিক গড়ে ৫০ কেজি মুড়ি ভাজতে পারলে খরচ বাদ দিয়ে ৫ থেকে ৬শ টাকা লাভ হয়। তবে নিজেরা ধান কিনে মুড়ি ভেজে শহরে নিয়ে বিক্রি করলে আরো দ্বিগুণ লাভ। তাই স্বল্পপুঁজির মানুষ রমজান মাসে মুড়ি ভেজে কমপক্ষে ২০ হাজার ও বড় একান্নবর্তী পরিবারগুলো ৩৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করে। মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত তিমিরকাঠী গ্রামের হাওলাদার বাড়ির শেফালী বেগম (৬৫) জানান, ৩১ বছর পূর্বে তার স্বামী মারা গেছেন। এরপর থেকেই একমাত্র পুত্র সন্তান রুহুল আমিনকে নিয়ে মুড়ি ভেজে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। তার পুত্রবধূও তাকে সাহায্য করছেন। ছেলে রুহুল মুড়ি ভাজা শেষে তা বাজারে বিক্রি করছেন। সব মিলিয়ে বেশ ভালই আছেন তারা। স্থানীয় আড়তদাররা এ গ্রাম থেকে মুড়ি সংগ্রহ করে তা ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, চাঁদপুর, ঝালকাঠি ও গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারদের হাতে তুলে দেন। একেকজন পাইকার রমজান মাসকে সামনে রেখে এ গ্রামে লগ্নি করেন ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। তারাও মূলধনের পাশাপাশি লাভের অংশটি বুঝে নেন রমজান মাসে। মুড়ির গ্রাম তিমিরকাঠীতে সবচেয়ে ভালো ও উন্নতমানের প্রতিকেজি মুড়ি পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৬৪ টাকায়। মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরবর্তী বরিশাল নগরীতে সেই মুড়ি খুচরা বাজারে ৩০ টাকা কেজিপ্রতি বাড়িয়ে বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে একশ টাকায়। স্থানীয় ধানের ৫০ টাকা কেজির মুড়ি ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়। আর নগরীর বিভিন্ন মুড়ির বাজারে ভেজাল সারযুক্ত যে মুড়ি পাওয়া যাচ্ছে তার দাম প্রতিকেজি ৮৫ টাকা। অথচ এরচেয়ে অনেক ভালো মানের মুড়ি তিমিরকাঠীর আড়তে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৩ টাকায়।