চোখে গোল চশমা, মাথায় কোকড়া চুল আর দু’ চোখ ভরা কৌতূহলী চাহনি; বিস্ময় মাখা চোখ-মুখ নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে বিশাল শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ছেলেটিকে দেখেই মনে হল, গোয়েন্দা উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো কিশোর। না, উপন্যাস থেকে উঠে আসেনি রওশ মুবিন বিজয়; এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। জন্মসূত্রে বাংলাদেশেরই ছেলে বিজয় তিন বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছে। সেখানে বসেই টিভিতে দেখে দেখে চিনেছে এই শেরে বাংলা স্টেডিয়াম; চিনেছে এবং নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় তারকা বানিয়ে ফেলেছে তামিম-সাকিবদের। এবার ছুটিতে এসেই তাই চাচার হাত ধরে বিজয় ছুটে এসেছিল স্টেডিয়ামে। চাচা বুঝিয়েছেন—এখন খেলা নেই, অনুশীলন নেই; মাঠে গিয়ে খালি চেয়ার আর ঘাস ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাবে না। বিজয়ের তাতেও আপত্তি নেই। জোর করে বলেছে, ‘খালি স্টেডিয়ামই দেখব। আমার কপাল ভালো হলে দেখবে খেলোয়াড়রা কেউ না কেউ চলে আসবে।’ ভক্তের চাওয়ার চেয়ে জোরদার নাকী আর কিছুই নেই। সে কথাই প্রমাণ করতে যেন অনুশীলন করতে চলে এসেছিলেন তামিম ইকবাল। স্বপ্ন পূরণের মতো চোখের সামনে তামিমকে দেখে নির্বাক হয়ে গেলো বিজয়। শুধু দেখা নয়, হাত মেলানোও হল। আর বিজয়ের এই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার কারণ একটাই—ছুটির দিনেও তামিম ইকবালের ব্যাটিংটা ঝালিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। শুধু তামিম নন; তিন সপ্তাহের কন্ডিশনিং ক্যাম্প শেষে ছয় দিনের এই ছুটির মধ্যে আরেক ওপেনার জহুরুল ইসলাম অমি এবং ইনজুরি থেকে সেরে ওঠা পেসার নাজমুল হোসেন। আর এদের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রচণ্ড জ্যাম ঠেলে দিব্যি মাঠে চলে এসেছিলেন ফিল্ডিং ও ব্যাটিং কোচ কোরি রিচার্ডস।
অমির কাছে কোরি রিচার্ডসের এই সহযোগিতাটা বেশ তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার। নিজের কিছু ব্যাটিং সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে অনুশীলন করতে চাওয়া অমি বলছিলেন, ‘কোরি প্রথম দিনই বলেছে, ওকে ডাকলেই পাবো আমরা। ও কাজেও তাই করে। এরকম আলাদা করে কাজ করতে চাইলেই চলে আসে। এতে আমরা যারা আলাদা কিছু নিয়ে কাজ করতে চাই, তাদের খুব উপকার হয়।’ তামিম অবশ্য এরকম বিশেষায়িত কোনো ব্যাপার নিয়ে কাজ ঠিক করছেন না। বোলিং মেশিনে কোরি রিচার্ডসেরই তত্ত্বাবধানে শত শত বল খেলে নিজেকে পুরো প্রস্তুত রাখা। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। এখন তো সামনেই কোনো খেলা নেই, কোনো প্রতিপক্ষ এখনই ছুটে আসছে না বল হাতে; তাহলে তামিমের কেন নিজেকে প্রস্তুত রাখার এই ব্যস্ততা? তামিম অনুশীলন শেষ করে ঘামতে ঘামতে উত্তর দিলেন, ‘আমি দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছি। এখানে নিজেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত করে নিয়েই যেতে হবে।’
হ্যাঁ, ক্যারিবিয় প্রিমিয়ার লিগে সেন্ট লুসিয়ার হয়ে খেলাটাকে দেশের প্রতিনিধিত্ব হিসেবেই দেখছেন তামিম ইকবাল। কেন এভাবে দেখছেন, তার অসাধারণ ব্যাখ্যাও আছে বাঁ হাতি এই ওপেনারের কাছে, ‘আমি ওখানে ভালো খেললে, সবাই বলবে দিস ইস তামিম ইকবাল ফ্রম বাংলাদেশ। আবার খারাপ খেললেও দেশের নাম আসবে। ভালো খেলা, খারাপ খেলাটা তো পুরোপুরি আমার হাতে নেই। কিন্তু ব্যাপারটা যখন এরকম দেশের নামের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে, তখন নিজেকে আরও বেশি প্রস্তুত রাখার বিকল্প নেই।’ নিজেকে প্রস্তুত রাখা, এরকম বাড়তি অনুশীলন করার চ্যালেঞ্জ নেয়ার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে এরকম টুর্নামেন্টে খেলার আরও একটা চাপের কথা মনে করিয়ে দিলেন তামিম, ‘আমাদের এখানে কী হয়? লিগে ফরেনারটা ভালো না খেললে, সবাই সমালোচনা করে না? ওখানেও তো আমি ওদের ফরেনার। আরেকটা ব্যাপার হল, আমরা যখন বাংলাদেশের হয়ে খেলতে যাই, সবাই সবার পাশে থাকে; বন্ধুরা মিলেই যাই। এখানে টিমের হেল্প পাবো না, তা না; কিন্তু লড়াইটা তো একারই করতে হবে।’ অবশ্য তামিম বলতে গিয়েও একটা ব্যাপার ভুলে গেলেন হয়তো—লড়াইটা তার একাকে করতে হতে পারে; কিন্তু এক মাসের দীর্ঘ এই ক্যারিবিয় সফরে একবারে বন্ধুহীন থাকতে হবে না তাকে। বন্ধুহীন কিভাবে হবেন? জীবনের সেরা বন্ধু, ক’দিন আগেই সহধর্মীনি হওয়া আয়েশা সিদ্দিকা যে এই সফরে সঙ্গী হচ্ছেন তার! এমন সফরে লড়াইও উপভোগ্য হয়।
