পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর যেন অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৩, ২৩:২৬
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অধিদপ্তরে নিয়োগ হয় টাকার বিনিময়ে। কেনাকাটার নামে চলে অর্থ লোপাট। একটি সিন্ডিকেট অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছে। এই সিন্ডিকেটের প্রধান অধিদপ্তরেরই একজন পরিচালক। পরিচালককে মদদ দিচ্ছেন সরকার দলীয় ক্ষমতাবান দুই রাজনীতিক। এই দুই রাজনীতিকের পৃষ্ঠপোষকতায় ওই পরিচালক পুরো অধিদপ্তরকে জিম্মি করে রেখেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অন্যতম প্রধান কাজ সারা দেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো। সিন্ডিকেট জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি ক্রয় সংক্রান্ত দুর্নীতি করে পুরো কার্যক্রমটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। সর্বশেষ ১২৬ কোটি টাকার জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি কেলেঙ্কারির একটি ঘটনা উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই জন কর্মকর্তা বলেন, সিন্ডিকেটের প্রধান এখন যে পদে বহাল, সত্যিকার অর্থে তার ওই পদে বসার যোগ্যতা নেই। চার দলীয় জোট সরকারের আমলেও তিনি নিয়োগ বাণিজ্য ও জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়িসহ অন্যান্য সামগ্রী কেনাকাটার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সে সময় মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও টাকার ভাগ দিতেন তিনি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একই ব্যক্তি হয়ে গেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক। ওই পরিচালকের পদটি যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার। আরেক কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতিতে অভিজ্ঞ বলেই হয়তো তিনি এ পদে নিয়োগ পেয়েছেন। অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ১১২ কোটি টাকার ১৫০ মিলিয়ন সাইকেল স্বল্প মাত্রার জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি (পিল) ক্রয় করা নিয়ে সিন্ডিকেট দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে। এই বড়ি কেনার বাজেট ১১২ কোটি টাকার হলেও নিম্ন মানের জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ির মূল্য বাড়িয়ে বাজেটে ১২৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর পেছনেও আছেন ওই দুই রাজনীতিক। স্বয়ং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব) ডা. মুজিবর রহমান ফকির জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি কেনা নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিলেও সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ আজো বাস্তবায়িত হয়নি। জানা গেছে, বাংলাদেশের অনেক কোম্পানি জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি তৈরি করে। অথচ সিন্ডিকেট একটি বিদেশি কোম্পানিকে বড়ি সরবরাহের জন্য মনোনীত করেছে। যদিও কোম্পানিটির নিবন্ধন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ওই কোম্পানিটির নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ওই কোম্পানিটি নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করেছে। এই সিন্ডিকেট গত কয়েক বছর ধরে নিম্ন মানের জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি একচেটিয়াভাবে উচ্চ মূল্যে ক্রয় করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা বলেন, এই দুর্নীতি শুধু সিন্ডিকেটের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, তাদের পিছনে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা ও বাইরের ক্ষমতাধর ব্যক্তি রয়েছেন। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (লজিস্ট্রিক এন্ড সাপ্লাই) মো. কফিল উদ্দিন বলেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ির বিষয়টি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, এর বাইরে কিছু বলতে পারছি না। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব) ডা. মুজিবর রহমান ফকির বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে নিয়োগ ও জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি কেনা নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে আগামী সপ্তাহে বৈঠক হবে। অধিদপ্তরের অনিয়ম ও দুর্নীতি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সম্প্রতি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ে আট সহস্রাধিক কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর ৯০ ভাগই নিয়োগ দেয়া হয়েছে টাকার বিনিময়ে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রার্থীদের নামের পাশে ‘টিক চিহ্ন’ সম্বলিত একটি তালিকা আসে সিন্ডিকেটের প্রধানের কাছে। ওই তালিকা অনুযায়ী সম্পন্ন হয় নিয়োগ। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকায় একেকজন প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা প্রতিটি নিয়োগে নিয়েছেন দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে। বাকি টাকা সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা ভাগাভাগি করে নেন। বর্তমানে ৫ সহস্রাধিক মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীর নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। এই নিয়োগও একই পন্থায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে বলে ওই কর্মকর্তারা জানান। স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা. আফম রুহুল হক বলেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ির বিষয়টি আদালতে সমাধান হবে। আর নিয়োগ নিয়ে কোন ধরনের অনিয়ম যাতে করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রমাণসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নিবেন বলে তিনি জানান।