রোজা ইসলামী পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। প্রত্যেক মুসলমান রোজা রাখবেন এটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে অনেকেই আছেন যারা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। তাঁরা একদিকে যেমন রোজা রাখতে চান, অন্যদিকে আবার ডায়াবেটিস নিয়ে রোজা রাখা যাবে কিনা বা কিভাবে রাখতে হবে তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ভোগেন। অনেকে ভয়ে রোজা রাখেন না, অনেকে আবার নিজের মত করে ওষুধ পরিবর্তন করেই রোজা রাখতে চান। মোট কথা ডায়াবেটিস রোগীর রোজা রাখা নিয়ে অনেক রোগী, এমনকি অনেক ডাক্তারও বিভ্রান্তিতে ভোগেন। অথচ আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য রোজা রাখা অনেক সহজ করে দিয়েছে। ডায়াবেটিস হলে রোগী রোজা রাখতে পারবেন না একথা মোটেই ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ এবং ইসলামী আলেমগণ উভয়েই রোজা রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন। সুতরাং যেসব ডায়াবেটিস রোগী ঝুঁকির কথা জেনেও ধর্মীয় কারণে রোজা রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, তারা রোজার শুরুতেই চিকিত্সকের সাথে পরামর্শ করে জটিলতা এড়িয়েই রোজা রাখতে পারেন।
ডায়াবেটিস রোগে অনেক ধরণের জটিলতা হতে পারে। যেহেতু একজন রোজাদারকে সূর্য্যেদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনেকক্ষণ না খেতে থাকতে হয়, তাই তাদের জটিলতার সম্ভাবনা আরো বেশি। রোজার সময় ডায়াবেটিক রোগীদের যে সমস্ত জটিলতা হতে পারে তা হলো- রক্তের সুগার অতিরিক্ত কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া), সুগার অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া (হাইপারগ্লাইসেমিয়া), পানি শূন্যতা এবং ডায়াবেটিক কিটো এসিডোসিস। এছাড়া অনেকে এই মাসে রোজা রেখেও বাকি সময় অতিরিক্ত খাওয়া দাওয়া করেন এবং ব্যায়াম বা হাঁটাচলা প্রায় করেনই না, ফলে রক্তের চর্বি এবং শরীরের ওজন বেড়ে যায় ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ অনেক সময়ই থাকেনা।
অনেকক্ষণ খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকলে রক্তে সুগারের মাত্রা কমে যেতে পারে, তাকে বলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া। বিশেষ করে যারা সালফোনাইলইউরিয়া জাতীয় ওষুধ খান, ইনসুলিন নেন, সেহেরী খান না বা খুব কম খান অথবা রোজা রেখে অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন তাদের এই ঝুঁকিটা বেশি। হাইপ্রোগ্লাইসেমিয়া বোঝার উপায় হলো-বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম দেয়া, মাথা ঘোরা, শরীর কাঁপা, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি। এতে রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে সম্ভব হলে সাথে সাথে রক্তের সুগারের পরিমাণ পরীক্ষা করে দেখা উচিত। সুগারের পরিমাণ ৩ বা এর নিচে হলে রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। সাথে সাথে গ্লুকোজ বা চিনির সরবত বা যে কোন খাবার খেতে দিতে হবে।
রক্তের সুগার কখনও অতিরিক্ত বেড়ে যেতে পারে, তাকে বলে হাইপারগ্লাইসেমিয়া। এর লক্ষণ হলো জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, পানি শূন্যতা, দুর্বলতা, ঝিমুনি, বমি ইত্যাদি। এক্ষেত্রে সাথে সাথে রক্তের সুগার পরীক্ষা করাতে হবে এবং এর পরিমাণ বেশি হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন নিতে হবে। রোজা অবস্থায় ইনসুলিন ইনজেকশন নিলে রোজা নষ্ট হবে না বলেই অনেক ইসলামী চিন্তবিদগণের অভিমত।
শরীরের পানি শূন্যতা দূর করার উপায় হলো রাতের বেলা পানি বেশি বেশি পান করা। তার পরও যদি রোজা রাখা অবস্থায় পানি শূন্যতার পরিমাণ বেশি হয় যেমন জিহ্বা অতিরিক্ত শুষ্ক হওয়া, বেশি বেশি মাথা ঘোরানো, প্রস্রাবের পরিমাণ অতিরিক্ত কম ইত্যাদির কোন লক্ষণ দেখা যায় তবে সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে রোজা ভাংতে হবে। যারা বেশি কায়িক পরিশ্রম করেন বা বাইরে অতিরিক্ত গরমের মধ্যে কাজ করেন, তাদের বেলায় এই ঝুঁকি বেশি থাকে। অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে এই পানি শূন্যতা আরো প্রকট হতে পারে।
যারা শুধুমাত্র খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখেন তাদের জন্য রোজা হল সুবর্ন সুযোগ। রোজা তাদের জন্য কোন জটিলতা সৃষ্টি করেনা, বরং রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। রোজায় দিনে বেলা খাওয়া থেকে বিরত থাকা ও ইফতার এবং সেহেরিতে সময় মত পরিমিত আহারের অভ্যাস যে কোন ডায়াবেটিস রোগীকে সংযম ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দেয়, যা ডায়াবেটিসের চিকিত্সার মূল উপাদান। এর মাধ্যমে রোগী তার রক্তের সুগার এবং চর্বির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারেন, বাড়তি ওজন ঝেড়েও ফেলতে পারেন।
অনেক রোজার সময় অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করেন, অনেকে আবার খুবই অল্প আহার করেন। মনে রাখতে হবে ডায়াবেটিক রোগীর জন্য দুটিই ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে নিচের পরামর্শগুলো মেনে চলা যেতে পারে-
সেহেরীর খাবার সেহেরীর শেষ সয়ে খাওয়া
ইফতারের সময় বেশি বেশি চর্বিযুক্ত বা মিষ্টি জাতীয় খাবার না খাওয়া
ভাজা-পোড়া খাবার অল্প পরিমাণে খাওয়া
পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও অন্যান্য তরল খাবার গ্রহন করা
খাদ্যের ক্যালরী ঠিক রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
ইফতারে অতিভোজন এবং সেহেরীতে অল্প আহার পারিহার করা
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে মুখে খাবার ওষুধ প্রয়োজন হয়। এর মেধ্য যারা মেটফরমিন, গ্লিটাজোন অথবা ইনক্রিটিন জাতীয় ওষুধ খেয়ে থাকেন, তাদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া হবার ঝুঁকি অনেক কম। তবে সালপোনাইলইউরিয়া জাতীয় অথবা ইনসুলিন রক্তের সুগারের মাত্রা অতিরিক্ত কমিয়ে দিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া করতে পারে। তাই এসব ওষুধ গ্রহণকারী রোগীর উচিত রমজানের শুরুতেই চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রাখা।
রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর ওষুধের কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণত যে সব পরিবর্তন করা হয় তা হল যারা তিনবার ওষুধ খান তাদের বেলায় বেশি মাত্রা ইফতারের সময় খাবেন এবং কম মাত্রাটুকু সেহেরীর সময় খাবেন। যদি দিনে দুইবার খেতে হয় তবে সকালের মাত্রাটি ইফতারের শুরুতে এবং রাতের মাত্রাটি অর্ধেক পরিমাণে সেহেরীর সময় খাবেন।
যারা ইনসুলিন গ্রহণ করেন তারা রোজায় দীর্ঘ মেয়াদী ইনসুলিন ব্যবহার করতে পারেন, এতে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম। এই ইনসুলিন ইফতারের সময় নিতে হবে এবং প্রয়োজনে শেষ রাতে অল্প মাত্রায় নিতে হবে। ইনসুলিন গ্রহণকারী রোগীদের অবশ্যই রমজানের শুরুতেই ইনসুলিনের ধরণ ও মাত্রা ঠিক করে নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞ ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমদের মতামত অনুযায়ী রোজা রাখা অবস্থায় রক্ত পরীক্ষা করা এমনকি প্রয়োজনে ইনসুলিন ইনজেকশন নেয়া যাবে, এতে রোজার কোন ক্ষতি হবে না। তাই সম্ভাব্য জটিলতা এড়ানোর জন্য ডায়াবেটিক রোগীর উচিত সেহেরীর ২ ঘন্টা পর এবং ইফতারের ১ ঘন্টা আগে রক্তের সুগার পরীক্ষা করা। এছাড়া দিনের বেলায় অধিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকা উচিত। ইফতার বা রাতের খাবারের ১ ঘন্টা পর ব্যায়াম করা যেতে পারে।
ডায়াবেটিক রোগরি রোজা রাখা যাবে কি যাবে না তা নিয়ে বহু বিতর্ক ছিল এবং আছে। যেহেতু রোজা আল্লাহ তায়ালার প্রদত্ত বিধানে একটি অপরিহায্য ফরজ এবং আল্লাহ তায়ালা নিজেই এর প্রতিদান দিবেন, তাই অজুহাত বা আলস্য করে রোজা পালন থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। কারণ একমাস রোজা পালনের মধ্য দিয়ে মানুষের দেহ মন এবং আত্মার পরিশুদ্ধির সুবর্ন সময়। ডায়াবেটিস এমনকি অন্য কোন রোগ হলেও চিকিত্সকগণ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরে রোজা রাখা বা না ব্যাপারে অবশ্যই সুন্দরভাবে সহায়তা প্রদান করবেন।
লেখক:ডীন, মেডিসিন অনুষদ
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
