রেবার মুখে দুঃখ জয়ের হাসি

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৩, ২১:০৭
বিধবা রেবা (৪৫) বছরখানেক আগেও ছিলেন হতদরিদ্রদেরই একজন। আর বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় নার্সারি করে চারা বিক্রির মাধ্যমে হয়েছেন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। অনেকটাই ঘুচেছে তার দু:খকষ্ট। সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের কাছে রেবা বর্ণনা করেছেন তার সেই দু:খ জয়ের কাহিনী। বরগুনা সদর উপজেলার পূর্বগুদিঘাটা গ্রামের হতদরিদ্র নওয়াব আলীর মেয়ে রেবা। একই উপজেলার যুগিরতবক গ্রামের সহায়সম্বলহীন খেজমত আলীর সঙ্গে ১৩/১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় তার। বিয়ের তিন বছরের মাথায় একটি সন্তান কোলে আসে তার। নাম রাখেন আবুল কালাম। টেনেটুনে চলছিল তিনজনের সংসার। দেড় বছর পর এক দিনের ডায়রিয়ায় অর্থের অভাবে বিনা চিকিত্সায় মারা যান দিনমজুর স্বামী খেজমত আলী। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দু’চোখে অন্ধকার দেখেন রেবা। একদিকে পেটে রাজ্যের ক্ষুধা, অপর দিকে শীর্ণকায় সন্তানের ক্ষুধার্ত শুকনো মুখ। দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। স্বামীর শোক বুকে চেপে প্যারালাইসে আক্রান্ত হতদরিদ্র পিতা নওয়াব আলী খার ঘরে আশ্রয় নেন রেবা। পরের বাড়িতে ঢেঁকিতে ধানভানা, থালাবাসন মাজা, যাঁতায় ডালভাঙ্গা, শিলনোড়ায় হলুদ-মরিচ পেষাসহ হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে দিনান্তে যা পান সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে মুখে তুলে দেন সারা দিন না খেয়ে থাকা শয্যাশায়ী পিতার মুখে। ছেলেকে বুকের দুধ খাইয়ে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেন বিছানায়। ভোরে অসুস্থ পিতার অস্পষ্ট ডাকে ঘুম ভাঙ্গে তার। আবার শুরু হয় পরের বাড়িতে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। এটাই ছিল রেবার রোজনামচা। কয়েক বছর পর অসুস্থ পিতাও চোখ বোঁজেন। ছোট ভাই আদম খা বোনকে একখন্ড জমি দেন। ঘর তুলে সেখানেই ছেলে আবু কালামকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন তিনি। এক সময় ছেলে বড় হয়। বিয়ে দিয়ে ঘরে সুন্দরী বউও আনেন। একটি সন্তান হওয়ার পর লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন আবু কালাম। অর্থের অভাবে বিনা চিকিত্সায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। ছেলের বউ একমাত্র শিশুপুত্র ও স্বামীকে ফেলে অন্যত্র বিয়ে করে সংসারী হয়। আকাশ ভেঙ্গে পড়ে রেবার মাথায়। আবারও ভাবনার অথৈ সাগরে ভাসতে থাকেন তিনি। চেয়ে চিন্তে, গতর খেটে ছেলের চিকিত্সা করেন আর চোখের জল ফেলেন। এমনই এক দু:সময়ে ২০১১ সালের ২৭ নভেম্বর রেবাকে সদস্য করে নেয় বরগুনার স্থানীয় এনজিও জাগো নারীর রি-কল প্রকল্প । নার্সারির উপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে ২০১২ সালের ২১ এপ্রিল ৯ হাজার টাকার সার, বীজ, কীটনাশক, টালিসহ নার্সারির প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয় তাকে। কোন নগদ টাকা দেয়া হয়নি তাকে। বাড়ির আঙিনায় সাত হাজার টালিতে রেন্ট্রি, মেহগিনি ও চাম্বলের চারা রোপণ করে নার্সারি শুরু করেন রেবা। কাজে সহায়তা করে অসুস্থ ছেলে আবু কালাম। নার্সারি শুরুর ৫ মাস পর গত ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মাসে প্রথমবারে ৭৫টি চারা ১ হাজার পাঁচশ টাকায় বিক্রি করেন রেবা। নগদ টাকা হাতে পেয়ে উত্সাহ বেড়ে যায় তার। নতুন উদ্যমে নার্সারির যত্নে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। এবছর ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নার্সারি থেকে তার আয় হয় ৩২ হাজার ৩৭৫ টাকা। ইতোমধ্যে ৫ হাজার টাকায় ১০ শতাংশের একখন্ড জমি পাঁচ বছরের জন্য বন্ধক রেখেছেন তিনি। সেখানে তিনি রেন্ট্রি ও মেহগিনির চারা করেছেন। চারাগুলো বড় হয়েছে। এ চারা বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা আয় হবে বলে জানান রেবা। রেবার মুখে এখন দুঃখ জয়ের হাসি। প্রত্যয়ের সুরে রেবা বলেন, “এহন দুহেরে আর ডরাই না। কাজ করলে খাইয়া পইরা বাঁচন যায়।” তিনি জানান, তার একখানা রিকসা ভ্যান হলে চারা বাজারজাত করতে সুবিধা হয়। পরিবহন খরচও বাঁচে। তিনি নার্সারির আয় দিয়ে চাষাবাদের জন্য একখন্ড জমি কিনতে চান। ]এছাড়া চান নিজ ভিটায় একটি টিনের ঘর তুলতে এবং নাতি মারুফকে পড়াশুনা করিয়ে মানুষের মত মানুষ করতে। রেবার সাফল্য দেখে গ্রামের কুদ্দুস, কবীরসহ অনেকেই নার্সারি করতে উদ্যোগী হয়েছেন। আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থা অক্সফামের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত জাগো নারীর রি-কল প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী রামপ্রসাদ জানান, বরগুনা সদর উপজেলার গৌরীচন্না ও ফুলঝুড়ি ইউনিয়নের নয়শ’ হতদরিদ্র পরিবার এবং বেতাগী উপজেলার সড়িষামুড়ি, কাজিরাবাদ ও মোকামিয়া ইউনিয়নের এক হাজার একশ’ হতদরিদ্র পরিবারকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে নার্সারি তৈরির কাজে ও হাঁস-মুরগী পালনে তাদের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হচ্ছে। দেয়া হচ্ছে রিকশা ভ্যানও। তিনি আরও জানান, উপকারভোগীদের হাতে কোন নগদ অর্থ দেয়া হয় না। প্রশিক্ষণের পর উপকরণ দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে।