নভেম্বর মাসের ১৮ তারিখে অর্থমন্ত্রী অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বলা বাহুল্য, এসবই অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং-এর ওপর। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটেল মার্কেটের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিদেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়া দরকার। তার মতে ‘দেশের অর্থনীতি এমন একটা পরিপক্ব অবস্থানে পৌঁছেছে যে এখন মনে হয় বিদেশে বিনিয়োগ করতে দেওয়াটা অন্যায় হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের ব্যাংক খাত দুর্বল নয়। তবে এ খাতে অনেক অসুবিধা আছে এবং যেকোনো দেশের ব্যাংক খাতেই এই সমস্যা থাকে। সময়মতো সমস্যাগুলোকে ঠিক করে নেওয়াও সম্ভব। তবে ব্যাংক খাত দুর্বল এটি ঠিক কথা নয়।’ ‘ব্যাংক একীভূত’করণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যাংকের একীভূত হওয়ার বিষয়টি চিন্তার মধ্যেই ছিল না। এ ব্যাপারে আইন আছে, কিন্তু সেটা দুর্বল। আইনে যা আছে সেটা আমার কাছে উপযুক্ত বলে মনে হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন যে, এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য করেন তিনি ব্যাংকারদের সম্পর্কে। তার মতে, যখনই কাউকে ঋণ দেওয়া হয়, ব্যাংকের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হয় ওই উদ্যোক্তা যেন খেলাপি হয়ে পড়েন। এটি ব্যাংকারদের একটা অস্ত্র। এ চরিত্র বদলাতে হবে।
আমি ওপরে অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যগুলো একটু বড় করেই তুলে ধরলাম। কারণ আবুল মাল আবদুল মুহিত এই সময়ে ১০ বছরের অর্থমন্ত্রী। এর আগেও তিনি বছরতিনেক অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি সরকারি একজন আমলা এবং বিদায়ী মন্ত্রিসভার বয়োজ্যেষ্ঠ মন্ত্রী। এই আলোকে ব্যাংকের ওপর তার মন্তব্যগুলো বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তার আগে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার এই মুহূর্তে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিদেশে বিনিয়োগ করতে দেওয়া হবে কিনা। হবে কি হবে না এটা ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আমার জানা মতে এবং পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, অনেক দেশেই আমাদের অনেক উদ্যোক্তার শিল্প-ব্যবসা আছে। যারা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ব্যাংকক, দুবাই ইত্যাদি দেশে যাতায়াত করেন তারা একথা জানেন। বেশ কিছুদিন আগে খবরের কাগজে দেখেছিলাম একটি খবর যাতে বলা হয়েছিল, ভিয়েতনামের অন্যতম বৃহত্তম পোশাক শিল্পের মালিক একজন বাংলাদেশি উদ্যোক্তা। কয়েকদিন আগেও একটি খবরে দেখেছি, সিঙ্গাপুরে আমাদের একজন বড় ব্যবসায়ী একটা হোল্ডিং কোম্পানি করেছেন যার অধীনে বাংলাদেশি কোম্পানি আছে। রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা তাদের রপ্তানির বিপরীতে রিটেনশন কোটায় ডলার পান যা তারা বিপণনের জন্য ব্যয় করতে পারেন। এই সুবাদে অনেকে বিদেশে কোম্পানি খুলতে/ব্যবসা করতে পারার কথা। নভেম্বরের ২৪ তারিখে একটি কাগজে চমকপ্রদ একটি খবর ছাপা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়া থেকে রেমিটেন্সের ৮০ শতাংশ আসছে অনানুষ্ঠানিক পথে। তার মানে ‘হুন্ডিতে’। এই যে খবর তার মধ্যে লুকায়িত থাকতে পারে আরেকটি ঘটনা। যে টাকা হুন্ডিতে পাঠানো হয় বলে বলা হচ্ছে সেই টাকার (ডলার) একটা অংশ হয়ত মালয়েশিয়াতেই থেকে যায়। বাংলাদেশের একশ্রেণির ব্যবসায়ী সেই টাকা মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ করে এবং তার বিনিময়ে তারা দেশে ‘রেমিটেন্স প্রাপকের’ আত্মীয়-স্বজনকে টাকা দিয়ে দেয়। এ রকম নানা পদ্ধতি আছে যার মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের একাংশ বিদেশে বিনিয়োগ করছে, ব্যবসা করছে— এমন একটা ধারণা জনমনে রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সরকারের অনুমতির বাইরেই দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনেকের বিদেশে বিনিয়োগ রয়েছে। অবশ্যই এই হিসাব সরকারের হাতে নেই। এখন যদি সরকারিভাবে অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে ঐ আগের বিনিয়োগের সঙ্গে নতুন বৈধ বিনিয়োগ একাকার হয়ে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন এখানে আরও রয়েছে। আমাদের ব্যবসায়ীদের একাংশের ধারণা, দেশে তাদের আর কিছু করার নেই। বিনিয়োগযোগ্য টাকা অনেক আছে। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক কোনো শিল্প করা সম্ভব নয়। তারা অবকাঠামোর সমস্যার কথা বলেন, বিদ্যুত্-গ্যাসের সমস্যার কথা বলেন। ব্যবসা করার সুবিধা নেই—একথা বলেন। জমি পাওয়া যায় না— একথাও বলেন। মোট কথা বিনিয়োগ করার মতো পরিবেশ নেই বলেই তারা সর্বত্র বলেন। অথচ সরকার দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে।
করভার লাঘব করা হচ্ছে। সুদের হার হ্রাস করা হচ্ছে। সারা দেশে ১০০ অর্থনৈতিক জোন তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রস্তুত। অবকাঠামোর উন্নতি হচ্ছে। বিদ্যুত্ ও গ্যাস সরবরাহে স্থিতাবস্থা কেটে যাচ্ছে। এভাবে দেখলে বোঝা যাবে বিনিয়োগের একটা পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক দল এখন হরতাল, অবরোধ দেয় না। জনগণও তা পছন্দ করে না। ব্যবসায়িক উন্নতি শিল্পের উন্নতির জন্য সারা দেশের মানুষ নিবেদিতপ্রাণ। বেসরকারি বিনিয়োগও ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। প্রাইভেট ক্রেডিটও সচল। এমতাবস্থায় তো আমাদের উদ্যোক্তাদের উচিত দেশেই মনোনিবেশ করা। একথা কি ঠিক যে, দেশে শিল্প করার মতো শিল্প নেই। একটা কথা বলা হয় শিল্প করতে গেলে একজনের গায়ে আরেকজন লাগে। একথাটি দুইবছর আগে বলেছিলেন ‘এফবিসিসিআই’-এর প্রেসিডেন্ট যিনি একজন বড় ব্যবসায়ী এবং যার ছবি বাসের পেছনেও দেখা যায়। তার কথার মর্মার্থ হচ্ছে, বাঙালি ব্যবসায়ীরা যখন যেটার পেছনে ছোটে, তখন সবাই একদিকে যায়। বহুমুখী প্রচেষ্টা হয় না। যদি একথা সত্যিও ধরে নেওয়া যায় তাহলেও তো বলা যায় না দেশে শিল্প করার মতো ‘শিল্প’ নেই। ইদানীং কাগজে দেখলাম অন্তত তিনটি কোম্পানি ‘মোটরসাইকেল এসেম্বলিং’ করার জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। একটি-দুটি কোম্পানি সম্ভবত উত্পাদনে গেছে। এমন সব উদ্যোগ দেশে গৃহীত হতে পারে।
আমাদের আমদানির পরিমাণ কিন্তু ‘হিউজ’। রপ্তানিকে ছাপিয়ে যায় প্রতি বছর। বস্তুত রপ্তানি কম, আমদানি অনেক বেশি। এর জন্য আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি হয় প্রতি বছর। এমতাবস্থায় দেশে বিনিয়োগ করতে আমাদের উদ্যোক্তারা অনুত্সাহিত কেন হচ্ছেন তা আমার বোধগম্য নয়। অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত করেছেন আমাদের অর্থনীতির সাবালকত্বের ওপর। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের অর্থনীতি আজ একটা দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। বিভিন্ন সূচকে আমাদের অবস্থান দৃঢ় কিন্তু এর অর্থ কি আমরা এখনই বিদেশে ডলার পাঠিয়ে বিনিয়োগ করার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেছি? দুই-এক বছর আগেও কথা উঠেছিল একটা। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তখন শনৈঃ শনৈঃ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তখন অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলেছিলেন, এত টাকা বিজার্ভে পড়ে আছে অথচ তার পরও আমরা বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছি। আমাদের উচিত ঋণের পরিমাণ কমিয়ে রিজার্ভের টাকা অবকাঠামো উন্নয়নে খরচ করা। এই মত বেশ প্রাধান্য পেতে থাকে। এই প্রসঙ্গেই কথা উঠে ‘রিজার্ভ’ কত থাকা দরকার। আমরা ্একসময়ে পড়েছিলাম, একটা দেশের রিজার্ভ থাকা দরকার অন্তত তিন মাসের আমদানির সমপরিমাণ ডলার/পাউন্ড। পরে দেখা গেল আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় টাল-মাটালে এই প্রয়োজনীয়তার পরিমাণ বেড়ে গেল। পরে বলা হলো বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কমপক্ষে ৭-৮ মাসের আমদানির সমপরিমাণ ডলার রিজার্ভ থাকা দরকার। এই প্রেক্ষাপটে রিজার্ভ থেকে টাকা নিয়ে অবকাঠামো গড়ে তোলার আলোচনায় আর অগ্রগতি হয়নি। সরকারও কিছু আর বলেনি, অর্থনীতিবিদরাও কিছু বলেননি। আমাদের বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, এখন কি অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে? আমার মতে মোটেই না। আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম আবার বাড়ছে। বিশেষ করে তেলের দাম আবার বাড়ছে। প্রতিবেশী দেশ এই মূল্যবৃদ্ধিতে ভীষণ খারাপ অবস্থায় পড়েছিল। তাদের রুপীর মূল্য মারাত্মকভাবে পড়ে যায়। খুবই সাম্প্রতিককালে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয়। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার আছে। বিশেষ করে একটা পরিসংখ্যান হিসাবের মধ্যে রাখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ দিয়ে ৮ মাসের প্রয়োজনীয় আমদানি করা যেত। কিন্তু ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৯ মাসে। এটা কিন্তু বেশ দুশ্চিন্তার। আমাদের আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে বেশি বেশি। রপ্তানি সেই অনুপাতে কম। রেমিটেন্স বৃদ্ধির পরিমাণও কম। তাই বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড পরিমাণের, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতিও ভালো নয়। অতএব এই মুহূর্তে বিদেশে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেওয়াটা কি ঠিক হবে?
n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
