ক্রিকেট অ্যাকাডেমির ছোট্ট মাঠটায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড়রা। মাঝে তিনটে নেটে তিন ব্যাটসম্যান অনুশীলন করে চলেছেন। হঠাত্ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। দৌড়ে অ্যাকাডেমি ভবনের দিকে ছুটল সবাই। কয়েকজন নেট বোলারকে নিয়ে শুধু রয়ে গেলেন মাঝের নেটে ছোটখাটো দেখতে এক ব্যাটসম্যান।
বৃষ্টির মধ্যে শুরু হলো তার তাণ্ডব। কোনো বল গিয়ে পড়ছে অ্যাকাডেমি ভবনের ছাদে, কোনো ছাদ পার করে স্টেডিয়াম পর্যন্ত চলে গেল! যেন বৃষ্টিকে হার মানাতেই এই ছক্কা-ঝড়। লম্বা লম্বা এই শটগুলো দেখেই অবাক হতেই হল—বাংলাদেশের যুব দল কী একজন শচীন টেন্ডুলকার পেয়ে গেল নাকি?
কাছে এসে হেলমেটটা খুলে ফেলতেই রহস্যটা উন্মোচিত হয়ে গেল। তিনি যুব দলের কেউ নন, ভিনদেশি কোনো লিটল মাস্টার নন; বৃষ্টিকে হার মানিয়ে ছক্কার পর ছক্কা পেটাতে থাকা ছোট-খাটো ব্যাটসম্যানটি বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম!
গতকাল জাতীয় দলের অনুশীলন ছুটির শেষ দিন গেছে। তারপরও আর ঘরে বসে ছুটি কাটাতে চাইলেন না মুশফিক। তাই গতকালই ব্যাট-প্যাড নিয়ে চলে এলেন মাঠে। সতীর্থ নাজমুল হোসেনকে নিয়ে অনূর্ধ্ব-২৩ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গেই অনুশীলনে ভিড়ে গেলেন। বোঝাই গেল, এখন অনুশীলনে নামার জন্য আর তর সইছে না মুশফিকদের।
আজই তাদের সে অপেক্ষার অবসান হচ্ছে। ছয় দিন ছুটির পর আজ থেকে আবার শুরু হচ্ছে জাতীয় দলের ক্যাম্প। তবে এবার আর ফিটনেস ক্যাম্প নয়; এবার শুরু হবে ‘স্কিল ডেভলপমেন্ট ক্যাম্প’। আর এরই মাঝে চলতি সপ্তাহে ‘এ’ দল, অনূর্ধ্ব-২৩ দল ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সাথে গোটা দুই-তিনেক ম্যাচ খেলে ফেলারও সুযোগ পাচ্ছেন অনেকদিন ধরে ক্রিকেটের বাইরে থাকা জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা।
আইসিসির এফটিপির অসমতার কারণেই বাংলাদেশ মাঝে মাঝেই লম্বা বিরতি পায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে। কিন্তু সেই সময়টা আবার নিজেদের প্রিমিয়ার লিগ, বিপিএল, জাতীয় লিগ, বিসিএল; নানারকম ক্রিকেটে বোঝাই থাকে। এবারের প্রায় ছয় মাসের বিরতিটা সেদিক থেকে একটু অন্যরকমই হতে যাচ্ছে—প্রিমিয়ার লিগ না হলে মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে কোনো ধরনের ক্রিকেট খেলবে না জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা।
আর এই সুযোগটাকেই ক্রিকেটারদের বেসিক ব্যাপারগুলো নিয়ে কাজ করার একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে কোচদের সামনে। এই ‘বেসিক’-এর অংশ হিসেবে প্রথমেই শেষ হয়েছে তিন সপ্তাহের কঠোর ফিটনেস ক্যাম্প। খেলোয়াড়রা স্বীকার করেছেন, এমন কঠিন ট্রেনিংয়ের সামনে তারা পড়েছিলেন অনেকদিন বাদে।
সেই কঠিন পর্ব সামলে ওঠার ছুটি শেষ করে আজ দুপুর থেকে মূলত টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ শুরু হবে। আজ থেকে অনুশীলনের নেতৃত্ব দিতে ছুটি কাটিয়ে গতকালই ঢাকায় পৌঁছানোর কথা জাতীয় দলের প্রধান কোচ শেন জার্গুনসেনেরও। এই পর্বে খেলোয়াড়দের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে তাদের সমস্যা নিয়ে কাজ করা হবে। কারো কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা থাকলে, সেটা সমাধানের চেষ্টা হবে। সঙ্গে কোনো খেলোয়াড়ের কোনো বিশেষ উন্নয়নের দরকার হলে, তাও করার চেষ্টা হবে।
এর মাঝে ১৭ তারিখ থেকে খেলোয়াড়রা অন্তত গোটা তিনেক অনুশীলন ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন। অন্তত তেমনটাই পরিকল্পনা করছে নির্বাচক কমিটি। বাংলাদেশ ‘এ’ দল, অনূর্ধ্ব-২৩ দল, অনূর্ধ্ব-১৯ দল ও জাতীয় দলের মধ্যে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হবে অনুশীলন ম্যাচগুলো। বয়সভিত্তিক দল দুটো যাবে ইংল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে বড় দুটো টুর্নামেন্টে। আর ‘এ’ দলের আছে পূর্ণাঙ্গ ইংল্যান্ড সফর। এসবকে সামনে রেখে ম্যাচ প্র্যাকটিসের কিছু সুযোগ করে দিতেই এই পরিকল্পনা। কিন্তু এখানে ঝামেলা হতে পারে মিরপুর মাঠের সংস্কার। মাঠ এই সময়ে পাওয়া যাবে কি না, পেলেও বৃষ্টিতে খেলার উপযুক্ত থাকবে কি না; তা নিয়ে একটু সংশয় আছেই।
তবে নির্বাচকরা যে কোনোভাবে ম্যাচগুলো আয়োজনে আগ্রহী। বিশেষ করে প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় ম্যাচ অনুশীলনের আর কোনো বিকল্প দেখছেন না নির্বাচকরা। এখন যদি বিসিবি-ক্লাব টানাপোড়েনে প্রিমিয়ার লিগ যদি না হয়, তাহলে নিউজিল্যান্ড সফরের আগ পর্যন্ত কয়েক জন খেলোয়াড় আর ম্যাচ খেলারই সুযোগ পাবেন না।
তেমন হলে শুধু স্কিল ডেভলপমেন্ট, ফিটনেস ক্যাম্প কী পারবে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে?
