সন্তানের বন্ধু হবেন যেভাবে

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪১
এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়ে, সন্তান-সন্তুতি আর এক পুরুষ আগের ছেলে-মেয়ে, সন্তান সন্তুতিদের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। আগে ধমকধামক আর কঠোর অনুশাসনের উপর সন্তান মানুষ হতো। আর এখন ঠিক তার উল্টো, এখন সন্তানের বন্ধু হতে হবে আপনাকে। সন্তানের সাথে বন্ধু হওয়ার বিষয়ে পরামর্শ নিয়ে লিখেছেন নজরুল ইসলাম সমবয়সী ছেলে-মেয়েরা মুহূর্তের মধ্যেই একজন আরেকজনের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু একজন বাবা কিংবা মা সন্তানের সাথে এই বন্ধুত্ব চাইলেই চট করে সেভাবে গড়তে পারেন না। কারণ বাবা-মায়ের সাথে যে বন্ধুত্ব তার ধরন স্বভাবতই বন্ধুর সাথে বন্ধুত্বের মতো হবে না এবং কিছু মৌলিক পার্থক্য সেখানে থাকবেই, আর এটাই বাস্তবতা। তাই বলে এমনটিও নয় যে, সন্তানের সাথে আপনার বন্ধুত্ব হবে না, বন্ধুত্ব অবশ্যই হবে, তবে তার ধরন, এটি গড়ার প্রক্রিয়া বয়স অনুযায়ী হবে কিছুটা ভিন্নভাবে ভিন্ন আবহে। এবং যার অনেকটাই নির্ভর করবে পরিবেশ পরিস্থিতির উপর। বিশেষ করে, বন্ধুত্বের কোনো বয়স নেই বা যেকোনো বয়সেই বন্ধুত্ব গড়া যায়—প্রচলিত এই কথাটি সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব গড়ার প্রশ্নে অন্তত চলবে না। কারণ সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে হবে শিশুকাল থেকেই। প্রফেশনের কারণে আপনি সন্তানের নিদ্রারত অবস্থায় অফিসে যাবেন, এবং রাতে আপনি যখন বাড়ি ফিরেন, ততক্ষণে সন্তান আপনার নিদ্রামগ্ন এবং এই পরিস্থিতি এক দুদিনের নয়, প্রায় সারা জীবনের। এমনকি অধিকাংশ ছুটির দিনেও আপনি সময় কাটাচ্ছেন অফিসিয়াল মেহমানদের সাথে, পার্টিতে। ফলে মাসের এক-আধটা ছুটিতে, তাও অল্প সময়ের জন্য সন্তানের সাথে যে সময়টুকু কাটাচ্ছেন, তাতে সন্তানের কাছে আপনি ক্ষণিকের অতিথির মতো। ফলে এই পরিস্থিতিতে সন্তানের সাথে বন্ধুত্বের কথা না বলে বরং বলা ভালো ‘সন্তানের সাথে দূরত্ব কমাবেন কিভাবে, সেটা। আর যাদের বাবা-মা দু’জনই চাকরি বা ব্যবসা করেন, তাদের সন্তানদের কি অবস্থা’ সেই নির্মম আলোচনায় না হয় না-ই গেলাম! বলছিলাম সন্তানের বন্ধু হবেন যেভাবে। আগেই বলেছি; সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব হতে হবে তার শিশু বেলাতেই, অর্থাত্ যত ব্যস্ততাই থাকুক সন্তান নিদ্রায় যাওয়ার আগেই আপনাকে ঘরে ফিরতে হবে এবং যতটা সম্ভব তার পাশে থাকতে হবে। অনেকেই হয়তো বলবেন, যে শিশু কথা বলতে পারে না তার পাশে বসে বা সময় কাটিয়ে কী হবে! অবশ্যই হবে। পাশে বসে আপনি তাকে দেখবেন, সে আপনাকে দেখবে এবং তার কৌতূহলী দৃষ্টির সাথে স্নেহ সোহাগ মাখা কথা বলবেন, ওই সময়ে এটাই বন্ধুত্ব। এভাবেই সে আপনাকে চিনবে ও জানবে এবং বড় হতে হতে সম্পর্ক গড়াবে অটুট বন্ধুত্বের দিকে, একই সাথে বন্ধু ও বাবা-মা। যেসব পরিবারে এই বন্ধন গড়ে উঠেছে, সেসব ঘরে লক্ষ করলে দেখবেন, বাবা-মা সন্তানকে পরিচয় করিয়ে দেয়, এটা আমার বন্ধু বাবা অথবা সন্তান বলছে, এটা আমার বাবা বন্ধু বা মামা বন্ধু। কিন্তু বড় হতে হতে বয়সের উত্তাল ঢেউয়ের বিপরীতে বাবা অথবা মামা বন্ধুর এই অটুট-মধুর সম্পর্ক অধিকাংশই আর অটুট থাকে না, ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু ছিন্ন হতে হতেও যে বন্ধনগুলো অটুট থাকে তার নেপথ্যে রয়েছে বাবা-মায়ের পারিবারিক পারস্পরিক সম্পর্ক-সম্মান, বিশ্বাস এবং ধৈর্য সহিষ্ণুতা, ধর্মীয় আনুগত্য ইত্যাদি। যা সন্তান অনুসরণ করে ও শিখে। বিশেষ করে স্পর্শ কাতর বয়সে অতিরিক্ত সতর্কতার সাথে বুঝিয়ে কথা বলা ও শাসন করাসহ বিভিন্ন কিছু কাজ করে বন্ধন অটুট রাখার পেছনে। সন্তানের সাথে বন্ধু হওয়ার কৌশল সম্পর্কে উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন ভুঁইয়ার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী দিলরুবা বেগম। তিনিও একটি স্কুলের হেড মিস্টেজের দায়িত্বে আছেন। আমাদের তিন সন্তানের মধ্যে বড়টা ডা. মাশরুরা রুবালিয়া, মেঝটাও মেয়ে মাফরুজা রুবালিয়া (লিনা) এবং সর্ব কনিষ্ঠটা ছেলে এএসএম মুনাইমুল হোসাইন (সিজান), ট্রেনি পাইলট। প্রফেশনের বাইরে সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজে আত্ননিয়োগের কারনে দিন-রাত একরকম ব্যস্ততায়ই কেটে যায় বলতে পারেন। কিন্তু ব্যস্ততা যতই থাকুক প্রতিদিন ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আমাদের পারিবারিক নিয়মিত যে বৈঠক হয়, সেটা কখনও মিস করিনা। আমার স্ত্রীও স্কুলের দায়দায়িত্বের কারনে অনেক ব্যস্ততা সত্বেও সন্তানদের সময় দেয়ার ব্যপারে তার কোন কার্পন্য নেই। আমাদের ছেলে মেয়েরা সবাই মোটামোটি বড়ই এখন, ফলে ওদের নিজস্ব একটা জগত্ গড়ে উঠলেও মা বাবা তথা পরিবারের ব্যপারে তারা বেশ সিনসিয়ার। প্রতিদিনের পারিবারিক বৈঠকটিতে তারা সানন্দে অংশগ্রহণ করে। কারন এই বৈঠকটিতে আড্ডা হয়, যে আড্ডায় থাকে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক, বিশেষকরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খেলাধুলা সংক্রান্ত আলোচনা। সেখানে যারযার দল মতের পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা হয়, যে আলোচনা ক্ষেত্র বিশেষ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আলোচ্য থেকে বাদ যায়না দেশ বিদেশের রুপালী পর্দা তথা নাট্য জগত্ও। আমরা সপরিবারে নাটক পাড়ায় বাদাম খেতেখেতে মঞ্চ নাটক দেখেছি, দেখেছি সিনেমাও। আবার বাসায় এক সাথে বসে হাসির নাটক-সিনেমা দেখি, দেখি লাভ স্টোরিও।’ তাই বলা যায়, ছেলে-মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দ জানার চেষ্টা করবেন এবং পড়ালেখার পাশাপাশি তারা অবসরটা যাতে ঘরেই কিংবা বাইরে নিকটাত্মীয়দের সাথে বা ভালো বন্ধুদের সাথে আনন্দ করে কাটাতে পারে (ভালো হয় কোনো খেলাধূলায় অংশগ্রহণ করলে) সেই সুযোগ করে দিন। বিশেষ করে সন্তানের আনন্দ-বেদনার অংশিদার আপনাকে হতে হবে। অনেকে হয়তো বলবেন, সন্তানদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আঁকড়ে না রেখে ওদেরকে ওদের মতো ছেড়ে দিন। ফলে আমাদের ছেলেমেয়েরাও সেভাবেই মানুষ হবে! কিন্তু প্রশ্ন হলো, তখন আর এখন কি এক? ফলে ওদের একদম ছেড়েও দেওয়া যাবে না আবার আবদ্ধও রাখা যাবে না।