বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তিনজন স্প্রিন্টার টাইসন গে, আসাফা পাওয়েল ও শেরোন সিম্পসন ডোপ টেস্টে পজিটিভ প্রমাণিত হওয়ায় আবারো বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়লো অ্যাথলেটিক্স বিশ্ব। অপরদিকে গে’র এই দশায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে উসেইন বোল্টের সাথে তার সম্ভাব্য দ্বৈরথ থেকে বঞ্চিত হলো ক্রীড়ামোদীরা। কেননা চলতি বছরে এই আমেরিকানটি ১০০ মিটারে তিনবার দ্রুততম সময়ে দৌড়িয়েছিলেন।
এমনিতেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডোপিং নিয়ে সমস্যার মধ্যেই ছিল অ্যাথলেটিক্স। তাও আবার এমন সময়ে টাইসন গে, আসাপা পাওয়েলের মতো ক্রীড়াবিদকে ডোপ পাপের কথা স্বীকার করতে হলো যখন তারা কিনা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতির মধ্যে ছিলেন।
সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন টাইসন গে এক দশকের মধ্যে সেরা আমেরিকান স্প্রিন্টার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন। ২০০৭ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তিনটি সোনা জয়ের পথে সেসময়ে ১০০ মিটারে বিশ্ব রেকর্ডধারী পাওয়েল ছাড়াও ২০০ মিটারে হারিয়েছিলেন বোল্টকে। পাওয়েলের স্বদেশী সিম্পসনও ২০০৪ অলিম্পিকে চারশ মিটার রিলেতে স্বর্ণজয়ী ও ২০১২ সালেরটিতে সিলভার জয়ী রিলে দলের সদস্য। গত রবিবার রাতে তারা নিজেরাই এ বিপর্যয়ের খবর দেন এবং জানান যে আগামী মাসে মস্কোয় অনুষ্ঠেয় বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেবেন না তারা।
বর্তমানে স্প্রিন্টের দুনিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে জয় পরাজয় নির্ধারিত হয়। সেজন্যই দৌড়বিদরা যে কোন নিষিদ্ধ বস্তুসহ যে কোন সুযোগ নিতে পিছপা হয় না। তাছাড়া একটা জয় মানেই তো আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও বিত্ত বৈভব। এ কারণে অ্যাথলেটিক্স বিশ্বে নিয়ামকদের সাথে ক্রীড়াবিদদের ইদুর বিড়াল খেলা চলছে অনেকদিন ধরেই যা বন্ধ হওয়ার কোন আলামত দেখা যাচ্ছে না।
টাইসন গে বলেছেন, ‘আমার মিথ্যা বলার কিছু নেই। আমি যে কোন শাস্তিই মেনে নেব। আমি বুঝতে পারছি কি করেছি। এটা এখন আমার দায়।’ তিনি এ ব্যাপারে ডোপিং বিরোধী কর্মকর্তাদের সাথে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গে জানান তিনি সবকিছু প্রকাশ করবেন। এমনকি যা যা নিয়েছেন, যেসব কোম্পানির কাছ থেকে নিয়েছেন সেসবও জানাবেন তিনি।
পাওয়েল জানিয়েছেন তিনি অক্সিলোফরিন নামের এক নিষিদ্ধ উদ্দীপক ব্যবহারের কারণে ধরা পড়েছেন। টুইটারে পাওয়েল দাবি করেন কিভাবে এটা তার শরীরে এলো সেটা তিনি নাকি জানেন না।
অ্যাথলেটিক্সে ডোপ পাপীদের সংখ্যা কম নয়। বিশেষ করে ১০০ মিটারে। এ তিনজনের আগে বেন জনসন, লিনফোর্ড ক্রিস্টি ও জাস্টিন গ্যাটলিনের মতো অলিম্পিক স্বর্ণজয়ীকে ডোপ পাপে নিষিদ্ধ হতে হয়েছে। ২০০ মিটারে দুইবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ভেরোনিকা ক্যাম্পবেল-ব্রাউনকে জুনে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক বাছাইয়ের সময় একই কারণে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল স্প্রিন্টার ডেবি ডানকে। বেজিং অলিম্পিকের ৪০০ মিটারের চ্যাম্পিয়ন আমেরিকান লসন মেরিটকে ২০১০ সালের অক্টোবরে ২১ মাসের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কাটাতে হয়েছিল। ড্রাগ টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে একটি যৌন বর্ধক পিল ব্যবহারকে দায়ী করেছিলেন তিনি। তবে আমেরিকান অ্যাথলিটদের মধ্যে সবচাইতে বড় মাপের ডোপ পাপীর নাম ম্যারিয়ন জোন্স, যিনি ২০০০ সালের সিডনি অলিম্পিকে ১০০ ও ২০০ দুটোতেই সোনা জিতেছিলেন। পরে অবশ্য তার জেতা পাঁচটি পদকই কেড়ে নেয়া হয় এবং জোন্সকে জেলেও যেতে হয়েছিল।
এত কিছুর মধ্যেও ৩০ বছর বয়সী গে’র জন্য পুরো পরিস্থিতিটি বেশি অবমাননাকর। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্ডি ডোপিং সংস্থার ‘মাই ভিক্টরি’ নামের এক প্রচারণায় অংশ নেয়া জনাকয়েক অ্যাথলিটের অন্যতম ছিলেন তিনি। এই প্রচারণায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘খেলা বলতে আমি শুধু পরিচ্ছন্ন খেলাকেই বুঝি যা কিনা সবধরনের প্রতারণা ও ডোপিং থেকে মুক্ত।’
জ্যামাইকানদের ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়ার কারণে বোল্টের নৈপুণ্যকেও খুটিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও ১০০ ও ২০০ মিটারের বিশ্ব রেকর্ডধারী বোল্ট দীর্ঘদিন ধরেই নিষিদ্ধ কিছু ব্যবহারের কথা অস্বীকার করে আসছেন। এ মাসের শুরুতেও তিনি রিপোর্টারদের কাছে দাবি করেন, ‘বিশ্বের কাছে প্রমাণের জন্য দরকার পড়লে প্রতিদিন আমার পরীক্ষা নেয়াকে আমি স্বাগত জানাই।’
অবশ্য ডোপ টেস্টে নেগেটিভ হওয়ার মানেই যে অ্যাথলিটটি ডোপ করেননি এমন নয়। এর বড় উদাহরণ ম্যারিয়ন জোন্স ও সরাসরি সাতবার ট্যুর ডি ফ্রান্স জয়ী ল্যান্স আর্মস্ট্রং। উভয়েই কোন বলবর্ধক ব্যবহার করেননি বলে দীর্ঘদিন দাবি করে আসছিলেন। তারা কখনো আনুষ্ঠানিক ডোপ টেস্টে ধরাও পড়েননি। তারপরও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত ডোপ নেয়ার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বোল্টের ব্যাপারেও চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সর্বশেষ ডোপিংয়ের ঘটনা প্রমাণ করে বিষয়টির উপর নিয়ামকদের এখনো যথেষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হয়নি। কিন্তু স্বতন্ত্র ডোপ বিরোধী বিশেষজ্ঞদের মত হলো অ্যাথলেটিক্স ও সাইক্লিংয়ে ঘন ঘন পরীক্ষা চালানোর কারণেই নিষিদ্ধ উদ্দীপক ব্যবহারকারীরা এভাবে ধরা পড়ছে।
