আব্দুর রাজ্জাকের একটা দুঃখ ছিল—তার ছোটবেলার ‘ব্যাটসম্যান’ পরিচয়টায় ইদানিং আর কেউ পাত্তা দিতে চাইত না। বুলাওয়েতে দেশের হয়ে দ্রুততম ফিফটি হাকিয়ে সে দুঃখ ঘুচিয়েছেন রাজ্জাক। এখন অন্তত লোকে মানে যে, রাজ্জাক একজন ব্যাটসম্যানও বটে!
তাহলে রাজ্জাকের আর কোনো দুঃখ নেই?
আব্দুর রাজ্জাক হাসেন। যে হাসি দিয়ে দেশে-বিদেশে ভক্তদের বছরের পর বছর মুগ্ধ করে রেখেছেন, যে হাসি দিয়ে উদযাপন করেছেন; সেই হাসি দিয়েই ভুলিয়ে দিতে চান আসল দুঃখটা। আসল দুঃখ?
রাজ্জাক মানুন আর নাই মানুন; দেশের সেরা বাহাতি এই স্পিনারের ক্যারিয়ারটা অনেক বড় একটা দুঃখের গল্প হয়ে আছে—টেস্ট ক্রিকেটে নিজেকে আদৌ প্রমাণ করতে না পারার দুঃখ।
ওয়ানডেতে দুইশ’র ওপরে উইকেটের মালিক; কিন্তু এখন প্রায় এক দশক দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে টেস্টই খেলেছেন মাত্র ৯টি। এতে আফসোস না থেকে উপায় আছে? তবে রাজ্জাক লড়াকু মানুষ; দুঃখটা সরাসরি স্বীকার করতে চান না। তারপরও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘ব্যাটসম্যান বলুন আর বোলার; ক্রিকেটারদের প্রধান স্বপ্ন থাকে টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে। সেখানেই যখন বলার মতো কিছু নেই, আফসোস তো থাকবেই। তবে এই পরিস্থিতির কারণটা জানি বলে সবসময় এই চিন্তায় অন্তত আচ্ছন্ন হয়ে থাকি না’।
রাজ্জাক মুখে যাই বলুন, টেস্টে তার বলার মতো কিছু না থাকাটা একটা বিস্ময়ের ব্যাপারই বটে। এটা ওই ব্যাটসম্যানশিপের চেয়েও বড় বিস্ময়।
ঘরোয়া ক্রিকেটে রাজ্জাক যখন যাত্রা শুরু করলেন, তাকে মূলত লোকেরা ‘টেস্ট বোলার’ বলে জানত। নিজেই গল্প শোনালেন, ‘বিকেএসপি থেকে আমি উঠে এলেও আমার প্রথম সাফল্য আসলে জাতীয় লিগেই। প্রথম জাতীয় লিগেই সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীদের তালিকায় নাম ছিল।’
লংগার ভার্সন ক্রিকেটে তার এই সাফল্য দেখে, ক্ল্যাসিক ডেলিভারি দেখে সবাই নিশ্চিত ছিলেন, রাজ্জাক টেস্ট ক্রিকেটের জন্য তৈরি। কিন্তু ২০০৪ সালে দূরন্ত ওয়ানডে অভিষেকের পর ২০০৬ সালে যখন সত্যিই টেস্ট অভিষেক হল; রাজ্জাক যেন একেবারেই অপ্রস্তুত এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চট্টগ্রামের সেই টেস্টে পেলেন না কোনো উইকেট। পরের টেস্ট খেলার জন্য এক বছর অপেক্ষা করে কলম্বোতে আবার মাঠে নামতে পারলেন; এবার ১০৯ রানে ১ উইকেট! তৃতীয় টেস্টের জন্য আবারও এক বছরের অপেক্ষা। মানে প্রথম তিন বছরে তিনটি টেস্ট খেলার সুযোগ পেলেন রাজ্জাক!
জীবনে কখনোই কোনো কাজের জন্য কারো ঘাড়ে দোষ চাপাতে পছন্দ করেন না। তারপরও এই খেলার সুযোগ না পাওয়াটাকেই বড় দুর্ভাগ্য বলে মনে করছেন রাজ্জাক, ‘আমি প্রথম টেস্টটায় ভালো করতে পারিনি। ওখানে একটাই ইনিংস বল করেছিলাম। এরপর থেকে আমি আসলে কখনোই আর টেস্টে প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে পারিনি। অপেক্ষা করেছি, অপেক্ষা করেছি; ডাক পাইনি। হঠাত্ করে একটা ম্যাচে খেলার সুযোগ পেয়েছি। এভাবে কোনো ফরম্যাটেই সাকসেস পাওয়া সম্ভব কি না, কে জানে। তবে কী জানেন, আমি কাউকে দোষ দেই না। আমি শুধু নিজেকে বলি, আমি তো ভালো করতে পারিনি।’
এর সঙ্গে আরেকটা ব্যাপার যোগ হয়েছে। ক্যারিয়ারের কিছুদিন যেতে না যেতেই তার গায়ে ‘ওয়ানডে বোলার’ বলে এক তকমা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এই তকমার কথা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। জানেন আর শব্দ দুটো শুনে শুধু হাসেন, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারি না, কেন এটা বলা হয়। হ্যা, ওয়ানডেতে আমার সাকসেস আছে। তার মানে তো আমি শুধু সেই ফরম্যাটের বোলার নই। এই নামে আমার কিছু যায় আসে না। কেউ বললো, আর আমি ওয়ানডে বোলার হয়ে গেলাম, ব্যাপারটা এরকম না। আমি কী, সেটা তো আমিই ঠিক করবো। তবে এই বিশেষণটা এখন আরেকটা চাপ হয়ে গেছে। হঠাত্ হঠাত্ যখন টেস্টে সুযোগ পাই, মনের মধ্যে এখন এটাও কাজ করে। মনে হয়, এটাকেও জয় করতে হবে।’
সবমিলিয়ে এখন নতুন করে টেস্টের ময়দানে নিজেকে প্রমাণ করা যে আরও কঠিন ব্যাপার, সেটা যে কারো চেয়ে ভালো বোঝেন রাজ্জাক নিজেই। নিজেই বোঝেন তার যে বয়স, বাংলাদেশের প্রতি বছর টেস্ট খেলার সুযোগ আসে যতো কম; তাতে টেস্ট ক্রিকেটের খাতায় নিজের নামটা পোক্ত করে লিখে যাওয়া এখন কঠিন এক কল্পনা। তারপরও রাজ্জাক লড়াইটা ছাড়েন না। তারপরও রাজ্জাক আরেকবার সাদা পোশাকে মাঠে নেমে নতুন কিছু করার জন্য ছটফট করতে থাকেন। সেই সঙ্গে আরেকবার নিজেকে প্রশ্ন করেন, ‘সর্বশেষ দু’বার টেস্ট দল থেকে বাদ পড়েই জাতীয় লিগে রেকর্ড বোলিং করেছি। তারপরও যখন চান্স আসে না, বুঝতে পারি না; ঠিক কী করতে হবে। তবে আমি হাল ছাড়ি না। কী হবে জানি না, তবে আমি আমার লড়াইটা চালিয়ে যাবো।’
সাফল্য নাকি লড়াকুদের জন্যই লেখা থাকে। দেখা যাক, রাজ্জাকের লড়াইয়ের ফল কী লেখা আছে!
