বিলাত-আমেরিকায় বেশিরভাগ তরুণই নতুন কিছু করতে চায়। সেখানে উদ্যোক্তা হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ তরুণই চায় চাকরি করতে। উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা সবার থাকে না।
তরুণরা মনে করে চাকরি অনেক সম্মানের পেশা এবং অধিক নিরাপত্তা। অন্যদিকে উদ্যোক্তা কিংবা ব্যবসাকে মনে করে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যবসা করতে অনেক টাকা লাগে। অনেক ঘুষটুস দিতে হয়। আবার যখন কোনো তরুণের মাথায় ব্যবসার আইডিয়া আসে তখন সে ভাবে কোন ব্যবসাটা করব, লাভ হবে কি না, কোনটাতে বেশি লাভ পাওয়া যাবে, কোথায় টাকা পাব ইত্যাদি ইত্যাদি। আর ঠিক তখনই পাশ থেকে কেউ একজন টোকা দিয়ে বলে, তুই ব্যবসা করে কী করবি? যা লাভ পাবি তার সবটুকুই ঘুষ দিতে হবে। বরং চাকরির জন্য পড়াশোনা কর। স্বপ্ন দ্যাখ আমি অমুক ক্যাডার হবো। অবশেষে সে তরুণের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন চুলোয় যায়।
আমার মতে, উদ্যোক্তা হতে প্রয়োজন ইচ্ছা, উদ্যম, তৃষ্ণা, আকাঙ্ক্ষা সর্বোপরি লেগে থাকার মানসিকতা। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা খুব কম সংখ্যক তরুণের মধ্যে আছে। কারণ তারা দ্রুত সফল হতে চায়। এটা ঠিক যে ব্যবসা করার জন্য টাকার প্রয়োজন আছে। কিন্তু যদি পথে নামার ইচ্ছাই না থাকে তাহলে ঐ টাকা দিয়ে কী হবে? কথা আছে—পথই পথ দেখায়। তাই ইচ্ছা, উদ্যম আর লেগে থাকার মানসিকতা নিয়ে নেমে পড়ুন লালিত সেই উদ্যোগের দিকে। দেখবেন কোথা থেকে টাকা চলে আসছে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন না।
আমি চাকরির বিরোধিতা করছি না। চাকরি নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু কোনো দেশের তরুণের ৯৫ অংশেরও বেশি যখন এই চাকরির পেছনে ছোটে তখন ঐ দেশের জন্য অনেকটা হুমকি হয়ে ওঠে এবং এর পরিণতি হয় করুণ। আমাদের দেশের তরুণরা বর্তমানে সম্মানে ভর্তি হওয়ার পরপরই এমপিথ্রি নামক বই পড়তে শুরু করে দেয়। লক্ষ্য একটাই—ভালো একটা চাকরি পেতে হবে। ফলে ‘উদ্যোক্তা’ শব্দটি তরুণদের অভিধান থেকে আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে।
৪০০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রধানত তিনটি পেশায় নিয়জিত ছিলেন—ব্যবসা, শিল্প এবং কৃষি। কৃষিতে তাঁদের মেধা এতই বিকশিত হয়েছিল যে, ৩৫০ প্রজাতির ধান উত্পাদন করতেন তাঁরা। আবার শিল্পে মসলিন-এর মতো সূক্ষ্ম কাপড় বানাতেন। আজ পর্যন্ত তুলা থেকে এর চেয়ে মিহি কাপড় তৈরি করা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রামে জাহাজ তৈরি হতো। চট্টগ্রামে যে ‘বহদ্দার হাট’ রয়েছে সেটি ছিল ‘বহরদার’ অর্থাত্ নৌবহরের দার বা প্রধানের জায়গা। সেই জাহাজে তাঁরা জাভা, সুমাত্রা, মালদ্বীপ, সিংহল প্রভৃতি জায়গায় যেতেন। সেসময় আমাদের এই উপমহাদেশের জিডিপি ছিল বিশ্বের জিডিপির ২২-২৩%।
চাকরির মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে উদ্যোক্তা হওয়ার সময় এসেছে। এখনই যদি আমরা ইংরেজদের প্রবর্তিত এই কুফল থেকে বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ অনেক খারাপ হবে তা নিশ্চিত। তাই আসুন নিজে উদ্যোক্তা হই—অন্যজনকেও উদ্যোক্তা হতে উত্সাহিত করি এবং দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
