তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যয়ও বাড়ছে সময়ের সাথে সাথে। সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার এবং বিভিন্ন ধরনের আইটি সার্ভিসের খাতে এই ব্যায় গত কয়েকবছর ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। আর তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর সরকারগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মোট ব্যায় দাঁড়াবে ২.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এই ব্যায় অনেক বেশি, যদিও এই ব্যয়ের মধ্যে ভোক্তা পর্যায়ের ব্যয়কে ধরাই হয়নি। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি বাজার গবেষণা সংস্থা ফরেস্টার তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সার্বিকভাবে পিসিতে ব্যয় ক্রমেই কমছে, আর তা বাড়ছে সফটওয়্যারে, বিশেষত অ্যাপ্লিকেশনে। প্রযুক্তি বিশ্বে এটি একটি বড় ধরনের পরিবর্তন।
ব্যয়ের শীর্ষে সফটওয়্যার
সময়ের সাথে সাথে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যায়ের চিত্র একদিকে যেমন ঊর্ধ্বমুখী, অন্যদিকে এর ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সামগ্রিক ব্যয়কে ফরেস্টার ভাগ করেছে ৫টি ভাগে। এগুলো হলো সফটওয়্যার, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, আইটি কনসাল্টিং সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন সার্ভিস, যোগাযোগের যন্ত্রপাতি এবং আইটি আউটসোর্সিং ও হার্ডওয়্যার মেইনটেন্যান্স। ফরেস্টার জানাচ্ছে, এই পাঁচটি ভাগে মধ্যে ব্যয়ের শীর্ষে রয়েছে সফটওয়্যার। একটা সময়ে হার্ডওয়্যার আইটি খাতে ব্যয়ের সিংহভাগ অংশ দখল করে রাখলেও বর্তমানে সফটওয়্যারই রয়েছে ব্যয়ের শীর্ষে। এই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ৫৪২ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আইটি আউটসোর্সিং ও হার্ডওয়্যার মেইনটেন্যান্স, যাতে মোট ব্যয় হয়েছে ৪১১ বিলিয়ন ডলার। পরের অবস্থানগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, আইটি কনসাল্টিং সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন সার্ভিস ও যোগাযোগ যন্ত্রাংশ এবং তাদের ব্যায় যথাক্রমে ৪০৪ বিলিয়ন ডলার, ৩৮৯ বিলিয়ন ডলার এবং ৩২২ বিলিয়ন ডলার। ফরেস্টারে বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু বার্টেলস জানাচ্ছেন, ‘প্রযুক্তি খাতে যে পরিবর্তনগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে ব্যয়ের খাতে সফটওয়্যারের শীর্ষে চলে আসা। ভবিষ্যতেও সম্ভবত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।’ সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস, স্মার্ট কম্পিউটিং কিংবা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের ছাড়িয়ে যাওয়াকে সফটওয়্যার খাতে ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে অভিহিত করেছে ফরেস্টার। সফটওয়্যার খাতে এ বছরের ব্যয় গত বছরের তুলনায় ৩.৩ শতাংশ বেশি। সামনের বছর অবশ্য এই ব্যয় আরও ৬.২ শতাংশ বাড়বে বলেই ধারণা করছে ফরেস্টার।
পিছিয়ে পড়ছে পিসি
কম্পিউটার যন্ত্রাংশের মধ্যে সবার চাইতে এগিয়ে রয়েছে পিসি। তবে এই পিসির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সব ধরনের ডেস্কটপ এবং ল্যাপটপ। ফরেস্টার জানাচ্ছে, চলতি বছরে এই খাতে সর্বমোট ব্যয় ১৩৪.২ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ট্যাবলেট পিসির বাজার ২১.১ বিলিয়ন ডলার। তবে সর্বমোট খরচে পিসি এগিয়ে থাকলেও পিসি মূলত পিছিয়ে পড়ছে। ফরেস্টারের হিসেবে এ বছরে পিসিতে ব্যয় বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশ। উইন্ডোজ ৮-এর আগমনও এই পরিমাণকে বাড়াতে পারেনি খুব একটা। তবে একই সময়ে ট্যাবলেট পিসির বাজার যেভাবে বাড়ছে, তাতে সামনের বছরগুলোতে এই পরিমাণ আরও বাড়বে বলেই ধারণা ফরেস্টারের। ট্যাবলেট পিসির বাজারে ফরেস্টারের হিসেবে এখনও এগিয়ে রয়েছে অ্যাপল’র আইপ্যাড। তবে অ্যান্ড্রয়েড গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ দখল করে রেখেছে। অ্যান্ড্রয়েড যেভাবে তাদের বাজার প্রসারিত করে চলেছে, তাতে করে একটা সময় আইপ্যাডকে তারা ছাড়িয়ে যাবে বলেই মন্তব্য ফরেস্টারের। আবার মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ ৮ অপারেটিং সিস্টেমে চালিত ট্যাবলেট পিসিগুলোও এই বাজারকে বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
ফরেস্টারের পিসির বাজার কমে যাওয়ার তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায় সার্বিকভাবে পিসি বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ার মধ্যেও। চলতি বছরের দ্বিতীয় চতুর্ভাগের হিসেবে আইডিসি দেখিয়েছে টানা ৫ চতুর্ভাগের মতো এই পরিমাণ কমেছে। তবে সার্বিকভাবে পিসি বিক্রির পরিমাণ কমে গেলেও এর মধ্যে আবার লিনাক্স এবং ম্যাক সিস্টেমের খাতে ব্যয়টা একটু বাড়তির দিকে রয়েছে। সেই জায়গায় মার খেয়ে যাচ্ছে উইন্ডোজ পিসি। পিসি এবং ট্যাবলেটি পিসির বাইরে কম্পিউটার যন্ত্রাংশে স্টেরেজ ডিভাইসে ব্যয় রয়েছে স্থিতিশীল। তবে সার্ভার এবং কম্পিউটার পেরিফেরালে ব্যয় কিছু পরিমাণে কমে যাবে বলেই জানাচ্ছে ফরেস্টার। আইটি কোম্পানিগুলো এই প্রবণতা অনুযায়ী ব্যবসা কৌশল সাজাবে বলে ধারণা করেছে তারা।
গার্টনাটের হিসেবেও কমছে পিসি’র ব্যয়
প্রযুক্তি বিশ্লেষক সংস্থা গার্টনার তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পিসি বিক্রি কমে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছে। গার্টনারের ওই প্রতিবেদন অনুাযায়ী চলতি বছরে সার্বিকভাবে কম্পিউটিং ডিভাইস বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে বলে জানানো হয়। তবে এর মধ্যে পিসি বিক্রির পরিমাণ কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে আল্ট্রামোবাইল, ট্যাবলেট পিসি এবং মোবাইল ফোন বিক্রি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে বলে জানিয়েছে এই প্রতিবেদন। সার্বিকভাবে সব ধরনের ডিভাইসে অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে আর সবার চাইতে এগিয়ে অ্যান্ড্রয়েড। দ্বিতীয় স্থানে উইন্ডোজ থাকলেও গত বছরের তুলনায় অ্যান্ড্রয়েডের বিক্রি যেখানে ৭০ শতাংশ বেড়েছে, উইন্ডোজ ডিভাইসের পরিমাণ সেখানে কিছুটা কমেই গেছে। পিসি’র জন্য এসব তথ্য তাই অনেকটাই আশঙ্কাজনক।
সবার শীর্ষে অ্যাপ্লিকেশন
প্রধান পাঁচটি খাতে যেমন সফটওয়্যার এগিয়ে, তেমনি আলাদা আলাদা করে বিবেচনায় নিলে দেখা যায় অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে সবার শীর্ষে। সফটওয়্যার খাতে যে ৫৪২ বিলিয়ন ডলার ব্যায়ের হিসেব করা হয়েছে,তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় অ্যাপ্লিকেশন খাতেই। এর পরিমাণ প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলার। সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস আর স্মার্ট অ্যাপ্লিকেশনের কল্যাণেই এই অবস্থান। অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মধ্যে ডেস্কটপ অ্যাপ্লিকেশনের তুলনায় যে এগিয়ে রয়েছে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনগুলো। ফরেস্টার জানাচ্ছে, ২৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ডেস্কটপ অ্যাপ্লিকেশন খাতে ব্যয় মাত্র ৩৮ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশনে ব্যয় ২৮ বিলিয়ন ডলার, এন্টারপ্রাইজ ভার্টিক্যাল অ্যাপ্লিকেশনে ব্যয় ৫১ বিলিয়ন ডলার এবং এন্টারপ্রাইজ প্রোসেস অ্যাপ্লিকেশনে ব্যয় ১১৮ বিলিয়ন ডলার। আরও ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করলে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় রয়েছে ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট এবং হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক অ্যাপ্লিকেশনগুলোতে। সার্বিকভাবে অ্যাপ্লিকেশনেরই জয়জয়কার প্রযুক্তি বিশ্বে।
এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, পিছিয়ে অ্যাপেক
বরাবরের মতো এবারেও আইটি খাতে ব্যয়ে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে এশিয়া-প্যাসিফিক (অ্যাপেক) অঞ্চলে এই খাতে ব্যয় বাড়লেও ডলারের মূল্যের প্রভাবে এই বাজার আসলে কমেছে। ফরেস্টারের হিসেব অনুযায়ী এ বছরের আইটি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় ৮১৯ বিলিয়ন ডলার। আগামী বছরে যা বেড়ে হবে ৮৭৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে পশ্চিম ইউরোপ এবং এশিয়া অঞ্চল মিলে আইটি খাতে যা ব্যয় করবে, তার প্রায় সমপরিমাণ ব্যয় করবে কেবল যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে, চলতি বছরের অঞ্চল হিসেবে ব্যয় বৃদ্ধিতে সবার চাইতে এগিয়ে রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকা। তাদের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০.৭ শতাংশ। তবে এশিয়া অঞ্চলের জন্য খুব একটা সুখবর জানাচ্ছে না ফরেস্টার। তাদের হিসেবে এই অঞ্চলে আইটি খাতে ব্যয় ৪.৩ শতাংশ বাড়লেও ডলারের মূল্যের প্রভাবে এটি মূল্য ৩.২ শতাংশ কম। এশিয়া অঞ্চলের মধ্যে চীনে এ বছরে আইটি ব্যয় ৭.৪ শতাংশ বাড়লেও ২০১১ সালে তাদের ৯.৩ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় তা কম। আবার গত বছরে অস্ট্রেলিয়ার এই খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ছিল ৩.৬ শতাংশ, যা এই বছরে কমে হয়েছে ২.৫ শতাংশ।
