তারাবীহ্ অর্থ বিশ্রাম, আরাম। তবে শব্দটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত-সুপরিচিত পরিভাষা হলেও পবিত্র কুরআন-হাদীসে তা পাওয়া যায় না বরং ‘কিয়ামুল লাইল’ ‘তাহাজ্জুদ’ ইত্যাদি দ্বারা রমজানের রাতের বিশেষ নামায-ইবাদত বোঝানো হয়েছে। আবার অর্থগত তাত্পর্য হারিয়ে বর্তমানে ‘তারাবীহ্’ অর্থ যেন তাড়াতাড়ি! এমনটি যাতে না হয় সেদিকে আন্তরিক হওয়া হাফিজ সাহেবান, মসজিদ কমিটি ও মুসল্লীদের কর্তব্য। কারণ,‘তারাবীহ্’তে তাড়াতাড়ির ফলে ভুলের স্রোতে সব ভালো ভেসে যেতে পারে। এশার নামাযের পরেই তারাবীহ্র ওয়াক্ত শুরু হয়। জামাআতের সঙ্গে নামাযরত অবস্থায় শুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন শোনার সৌভাগ্য হয় মূলতঃ তারাবীহ্র কারণে। আল-কুরআনে ৫৪০ টি রুকু রয়েছে, ৫৪০২৭=২০ রাকাআত তারাবীহ্র জামাআতে পুরো কুরআন শোনা বা ৩০২০= ৬০০ রাকাআত নামায জামাআতে আদায় কতই না মূল্যবান। এ নামাযের গুরুত্ব অপরিসীম, রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে মহান আল্লাহ্র শাহী দরবারে নিজের উপস্থিতি এবং সময়ের দীর্ঘতা বোঝানোর জন্য হাদীসে বলা হয়েছে “আল্লাহ্ রমজানের রোজাকে ফরজ করে দিয়েছেন এবং রাতে দাঁড়িয়ে ইবাদতকে(তারাবীহ্) বিধান করে দিয়েছেন” (ফিক্হুস্সুন্নাহ্)। সামর্থ্য থাকা অবস্থায় তারাবীহ্ ত্যাগ করা সুন্নাত ছেড়ে দেওয়ার নামান্তর এবং ইচ্ছাকৃত বা নিয়মিত সুন্নাত আমল ত্যাগ করা কবীরাহ্ গুনাহ্। হাদীসে আছে ‘ফরজ হওয়া ও উম্মতের জন্য কষ্ট সাধ্য হওয়ার আশঙ্কায় প্রিয়নবী (স.) নিয়মিত তারাবীহ্র জামাআতে হাজির না হলেও তিনি তা আদায়ের জন্য উত্সাহ দিতেন’। ইবনু আবি শায়বার ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ্ ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদীসে আছে “রসূল (সা.) তারাবীহ্ পড়ে ছিলেন”। ইমাম বাইহাকী (রহ.) এর বিশুদ্ধতম বর্ণনায় আছে— হযরত ওমর, ওসমান ও আলী (রা.) এর যুগে তারাবীহ্ পড়া হতো। ইমাম আবু হানিফা, শাফেঈ, আহ্মদ ইবনু হাম্বল প্রমুখ (রহ.) এর মতে তারাবীহ্ ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা’ যা জামাআতে আদায় করাও সুন্নাত, যা ওমর (রা.) এর সময় থেকে ব্যাপক ভাবে প্রচলিত হয়। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে তারবীহেত পবিত্র কুরআন খতম করা হয়। যা কুরআনের হিফাজত ,সম্মান ও উচ্চ মর্যাদার বাহক। সাহাবীগণের যুগে তারাবীহ্ এত দীর্ঘ সময় নিয়ে আদায় করা হতো যে ‘সাহারী’র সময় চলে যাওয়ার মত অবস্থা হতো। ‘মুওয়াত্তা ইমাম মালিক’ গ্রন্থে এ তথ্য রয়েছে। ইবাদতের উদ্দেশ্য একাগ্রতা ও বিনম্র আত্ম নিবেদন। পবিত্র রমজান মূলতঃ সে শিক্ষাই দেয়। কেননা, প্রিয়নবী (স.) বলেন“ যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল আদায় করল সে ঐ ব্যক্তির সমান হলো যে অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল ” (মেশকাত, বাইহাকী)। তারাবীহ্ নামাজ এমনই একটি সুযোগ যাতে রাত্রি জাগরণ ও কুরআনের মাহত্ম্য মানুষের ধৈর্য ও একাগ্রতা বাড়িয়ে দেয় এবং তা মহা কল্যাণপ্রদ। প্রিয়নবী (স.) বলেন “রোজা ও কুরআন (কেয়ামতে) আল্লাহ্র কাছে সুপারিশ করবে, রোজা বলবে, আয় পরওয়ারদিগার, আমি তাকে দিনে খাওয়া ও কুপ্রবৃত্তি হতে বাধা দিয়েছি , সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন এবং কুরআন বলবে : আমি তাকে রাতে ঘুমাতে বাধা দিয়েছি সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন ” (বায়হাকী)। বস্তুতঃ রহমত, মাগাফেরাত ও নাজাতের মহিমায় সমুজ্জ্বল মাহে রমজানে খতম তারবীহ্ মহান আল্লাহ্র খাস মেহেরবাণী। যা মু’মিন বান্দার মনে আল্লাহ্ প্রেম , ইবাদতমুখী চেতনা ও সদাচারের ভাবনা জাগিয়ে তোলে। এতেই প্রিয়নবীর (স.) অমীয় বাণীর নিত্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে “এ মাসে এক আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে ‘ হে ভালোর অন্বেষণকারী অগ্রসর হও , হে মন্দের অন্বেষণকারী থাম’ আল্লাহ্ এ মাসে বহু লোককে দোজখ থেকে মুক্তি দেন, আর তা প্রতি রাতেই হয়ে থাকে ” (তিরমিযি ,ইবনু মাজাহ)।
