আব্দুর রাজ্জাক, ইলিয়াস সানী, সোহরাওয়ার্দী শুভ, মোশাররফ রুবেল; এক নেটে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় চার বাঁহাতি স্পিনার সমানে বল করছিলেন। নেটের পাশে ফাঁকা জায়গায় নাজমুল হোসেন মিলনকে নিয়ে একটানা হুক আর পুল করে যাচ্ছেন জিয়াউর রহমান। এরপর এক নেট বোলারকে ডেকে জিয়া শুরু করলেন কপিবুক ডিফেন্স অনুশীলন।
ঘন্টা কয়েক টানা ব্যাটিং করে যখন বেরিয়ে আসছেন, পাশ থেকে ডাক দিলেন রাজ্জাক, ‘জিয়া ভালো ব্যাটিং হচ্ছে। ব্যাটিংয়ের চ্যালেঞ্জটা নাও।’
জিয়া বিনয়ের হাসি হেসে বুঝিয়ে দিলেন, চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন।
এই চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়িত করার জন্য আজই আরেকটা অনুশীলন ম্যাচ পাচ্ছেন জিয়াউর রহমানরা। ‘এ’ দল ও দুটি বয়স ভিত্তিক দলের সফরকে সামনে রেখে তিনটি অনুশীলন ম্যাচের দ্বিতীয়টি আজ মিরপুরে শুরু হবে সকাল নয়টা থেকে। জিয়া হয়তো ‘এ’ দলের হয়ে ইংল্যান্ডের বিমানে চাপতে পারেন। অবশ্য ‘এ’ দলের কথা ভেবে নয়, জিয়া নিজের জন্যই এখন বাড়তি একটু লড়াই করতে আগ্রহী। তার নিজের কাছে এর ব্যাখ্যাও আছে, ‘আমি তো মূলত ছিলাম বোলার। পরে লোকে ব্যাটসম্যান পরিচয়ে চিনল। জাতীয় দলে এবার টেস্ট ও ওয়ানডে খেললামও ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে। কিন্তু এই দুই ফরম্যাটে ব্যাট হাতে খুব ভালো কিছু করতে পারিনি। তার মানে আমার কোথাও ঘাটতি আছে। আর ঘাটতি পোষাতে বাড়তি পরিশ্রমের বিকল্প নেই। পরিশ্রম করলে যে কোনো সমস্যার সমাধান হয়।’ এই কথাটা বাংলাদেশে জিয়ার চেয়ে ভালো বোঝা খেলোয়াড়ই আসলে খুব কম আছেন। পরিশ্রম কীভাবে একজন মানুষকে হারিয়ে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে আবার আলোয় আনতে পারে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণই এই জিয়াউর রহমান।
খুলনার ছেলে জিয়ার ক্যারিয়ারটা শুরু হয়েছিল একেবারে নিখাদ পেস বোলার হিসেবে। ২০০৫-০৬ সালের দিকে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ও জাতীয় লিগে রীতিমতো ‘সেনসেশন’ বোলিং অলরাউন্ডার জিয়া; যে দারুণ পেস বল করে এবং শেষ দিকে চার-ছয় মারে। এই সময়ের দুরন্ত পারফরম্যান্সে ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও ডাক পেয়ে গেলেন। সে বিশ্বকাপেও একটা ম্যাচও খেলতে না পারলেও তখন বলাই হচ্ছিল—বাংলাদেশ অবশেষে আরেকজন সেনসেশন পেসার পাচ্ছে।
এই সময়ই নিয়তির আরেক রূপ দেখলেন জিয়া। ভারত সফরে পড়লেন ইনজুরিতে। আর সেই ইনজুরির ফলে চিকিত্সদের কাছ থেকে শুনতে হল, দুই বছর আর বল করতে পারবেন না! জিয়া নিজেই সেই সময়টা মনে করলে শিউরে ওঠেন, ‘ভয়াবহ একটা সময়। এক ধাক্কায় আমার চেনা জগত্টা বদলে গেল। কেউ পাশে ছিল না তখন। মাত্র বিয়ে করেছি। পরিবার থেকে পর্যন্ত কথা শুনতে হয়। আমি তো ক্রিকেট ছাড়া আর কিচ্ছু পারি না। আমি তখন কী করবো? আমি বোলার, বল করতে না পারলে আমি কিভাবে টিকবো!’ কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ছলছল করে ওঠে জিয়ার। কিন্তু জিয়া এই সময়ই এক অসামান্য সিদ্ধান্ত নিলেন—ব্যাটসম্যান হয়ে গেলেন। জিয়াই বলছিলেন, ‘আমি ব্যাটটা চালাতে মারতাম। গায়ে জোর তো আছে। ভাবলাম, যেহেতু ব্যাটিংয়ে সমস্যা নেই। এটাই মন দিয়ে করি। ঘন্টার পর ঘন্টা প্র্যাকটিস করতাম। বুঝতাম, ব্যাটিংটা হচ্ছে। কিন্তু দল পেতাম না। কে নেবে আমাকে দলে? তখনও খুব খারাপ অবস্থা ছিল। অবশেষে আমাকে বাঁচালো সুজন চাচা (খালেদ মাহমুদ)। কি বুঝে, কি ভেবে যে দলে নিল। আর আমি ভালো ব্যাটিং করে ফেললাম।’ তারপর তো গল্পের মতো। জিয়া বিশ্বরেকর্ডের কাছে যাওয়া ইনিংস খেললেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। আবার জাতীয় দলে এলেন। কিন্তু আবার জিয়া ধাক্কা খেলেন। এবার টেস্ট ও ওয়ানডে অভিষেক হল শূন্য রানে আউট হয়ে! তাহলে জিয়া এবারও হেরে যাবেন? তাই কী হয়! হারারে টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেট, বুলাওয়ে ওয়ানডেতে নিলেন ৫ উইকেট; এবার ব্যাটসম্যান জিয়ার দুর্দিনে ফিরে এলেন আবার বোলার জিয়া। জিয়া হাসেন, ‘বোলিংটা কিন্তু অনেক অনুশীলন করেছি জিম্বাবুয়ে সফরের আগে। ওই যে পরিশ্রম করলে সাফল্য আসে। এবার ব্যাটিং নিয়েও সেইরকম কাজ করতে চাই।’
তাহলে জিয়ার তত্ত্ব মতেই আমরা আবার ব্যাটসম্যান জিয়াকেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পেতে চলেছি!
