একটার পর একটা পর্ব পেরিয়ে এবারের লোকসভা নির্বাচন যত সমাপ্তির দিকে এগোচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে, রাজ্যে এবার বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে বহু-ইপ্সিত আসন-সমঝোতা সফল হলে বহুলাংশে বদলে যেত ৪২টি কেন্দ্রের ভোট-ভবিষ্যত্। একই সঙ্গে বাম ও কংগ্রেস উভয় শিবিরই উপলব্ধি করছে, রাজ্যে এবারেই আসন সমঝোতার প্রচেষ্টা একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ভেস্তে না গেলে তৃণমূলের আসনপ্রাপ্তি কিছুতেই ২০ পার হতো না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে এই সমঝোতা না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হলো রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল এবং বিজেপি। কারণ, কংগ্রেস ও বামেদের মধ্যে সমঝোতা হলে বিরোধী ভোটারদের কাছে একটা বার্তা যেতে পারত। তা হল, তৃণমূলের দুঃশাসনের অবসান করতে প্রকৃত বিকল্প হতে পারে এই জোট। ভোটারদের মনে এই চিন্তা দানা বাঁধার সম্ভাবনা থাকত।
সেই বার্তা শেষ পর্যন্ত না পৌঁছে দিতে পারার ফলেও ভোটবাজারে ভয়ানক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসকে। ভোটারদের কাছে বরং এই বার্তাটাই পৌঁছলো যে এ রাজ্যে তৃণমূলের সত্যিকারের বিকল্প হতে পারে একমাত্র বিজেপি। রাজনৈতিক পর্যালোচকরা মনে করছেন, ভোটারদের কাছে বিজেপি-নির্ভরতাই সম্ভবত বাম-কংগ্রেস সম্ভাব্য সমঝোতার পক্ষে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ফলে বহু কংগ্রেস সমর্থক, বেশ কিছু বামপন্থি সমর্থক-ভোটার এবার বিজেপিকেই ভোট দেবেন বিজেপির আদর্শের অনুরাগী না হয়েও, এমনকী বিজেপির নীতি ও কাজকর্মের প্রতি সর্বাংশে বীতশ্রদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও।
কারণ ধন-সম্পত্তি, সম্মান ইত্যাদি বহু কিছু খুইয়ে যে মানুষগুলো এখন রাজ্য শাসন থেকে তৃণমূলকে সরাতে বদ্ধপরিকর, তাদের কাছে এই মুহূর্তে আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতা আর মুখ্য বিষয় নয়। সেগুলি সব গৌন বিষয়ের তালিকায় চলে গিয়েছে। আর মুখ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে, কাকে ভোট দিলে তৃণমূলকে হারানো যাবে। বাম ও কংগ্রেসের জোট হলে এই ভোটাররাই অবধারিতভাবে সেদিকেই ঝুঁকতেন। এই পরিস্থিতিতে তারা ধরেই নিয়েছেন, বাম বা কংগ্রেসকে ভোট দিলে সেই ভোট অপচয়ই করা হবে।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, বাম ও কংগ্রেসের জোট না হওয়ায় বিস্তর সুবিধা হয়েছে। কারণ এই জোট হলে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ অংশও এই জোটের পক্ষেই থাকতেন। বিশেষ করে কংগ্রেস এবং বামফ্রন্ট থেকে ভেঙে তৃণমূলে যাওয়া লোকজন, নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই আবার জোটে ফিরে আসার চেষ্টা করতেন। সে ক্ষেত্রে তৃণমূলের ভোটব্যাংকে একটা বড় ভাঙন হওয়ার সম্ভাবনা থাকত; কিন্তু বাম ও কংগ্রেসের জোট শেষ পর্যন্ত না হওয়ায় তৃণমূলের সেই বিপদ খানিকটা কাটল। তবে বাম-কংগ্রেস জোট হলে যারা তৃণমূল থেকে বেরিয়ে এসে এই জোটকে ভোট দিতেনই, তারা এবার ভোট দেবেন বিজেপির প্রার্থীদের।
রাজ্যের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই জোট যদি হতো এবং তার ফলে অর্ধেক লোকসভা আসনে হয় জয়, না হয় জয়ের কাছাকাছি পৌঁছতে পারতো। এর পাশাপাশি আর দু’বছর পরে রাজ্য বিধানসভা ভোটে বিরোধীদের পক্ষে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারতো। সে ক্ষেত্রে তৃণমূলের বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারতো এই জোট।
তবে কে বলতে পারে, এই সাফল্য কিংবা সম্ভাবনার গভীরে হয়তো কেউ কেউ আগাম খুঁজে পেয়েছেন ভবিষ্যতের কোনো ব্যর্থতা বা আশঙ্কার গন্ধ। তা হলো রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় এলে তার মুখ্য শক্তি কারা হবে? কংগ্রেস না বাম? এমনটা কি হতে পারে, এই ভাবনা থেকেই টর্পেডো করে দেয়া হলো লোকসভা নির্বাচনের প্রায় হয়ে যাওয়া জোট সাফল্যকে?
চলতি সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে একটি তাত্পর্যপূর্ণ প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। তা হলো ভোটগ্রহণ যতই পর্ব থেকে পর্বান্তরে পৌঁছেছে, ততই ধীরে ধীরে হলেও ভয় ভাঙতে শুরু করেছে ভোটারদের। কেন্দ্রীয় বাহিনী ঠুঁটো জগন্নাথের মতো নির্বিকল্প সমাধির যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে দমে না গিয়ে জায়গায় জায়গায় প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসতে দেখা গিয়েছে সাধারণ ভোটারদেরই।
চলতি ভোটপর্বের প্রথম থেকেই রাজ্যে শাসক দল তৃণমূল স্পষ্ট করে দিয়েছিল, সন্ত্রাস করে আতঙ্কের আবহ জিইয়ে রাখা হবে ভোটগ্রহণের শেষদিন পর্যন্ত। যে কারণে বীরভূমের অনুব্রত মন্ডলদের মতো বাঘা বাঘা ম্যানেজাররা প্রথমদিন থেকেই হুঙ্কার দিতে শুরু করেছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্তই সেই দিক নির্দেশ করে দিয়েছিল। খোদ দলনেত্রী একাধিকবার বিভিন্ন জনসভায় বলেছেন, রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে ৪২টিই চাই।
ভোট সন্ত্রাসে লাগাম পরাতে নির্বাচন কমিশনও একাধিকবার শাসকদলের দাপুটে নেতাদের মুখে লাগাম পরানোর চেষ্টা করেছে। এমন কী বীরভূমে নির্বাচনের দিন কার্যত ঘরবন্দি করে রাখা হয়েছিল অনুব্রতকে। প্রথম তিন দফার ভোট হয়ে যাওয়ার পর তৃণমূল নেতৃত্ব বুঝতে পারে, পরিস্থিতি অনেকটাই তাদের হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। সেই পরিস্থিতিতেও দমে যাওয়ার বদলে আতঙ্ক আরো তীব্র করে দলের তরফে বলা হয়েছে শেষ পর্যন্ত মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকতে হবে। কারণ দলনেত্রী ৪২টির মধ্যে ৪২টি আসনই চান।
এবারের ভোটে ভোটারদের কাছে রক্ষাকবচের মতো ছিল ব্যাপক সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতির প্রতিশ্রুতি। আশা ছিল, লোকসভা ভোটকে অন্তত পঞ্চায়েত ভোটের মতো প্রহসনে পরিণত হতে দেবে না কেন্দ্রীয় বাহিনী। সে কারণেই বিরোধীদের তরফে বারবার দাবি ওঠে, রাজ্যের একশ শতাংশ বুথে দিতে হবে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। বিরোধীদের দাবি মেনে বাস্তবে কোথাও কোথাও প্রায় ১০০ শতাংশ কেন্দ্রীয় বাহিনী দেয়া হলেও, তারা নির্বিকার অবস্থান নেয়। একের পর এক বুথে তারা কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ হয়েই বসেছিল। সর্বত্রই তারা বলেছে, তাদের প্রধান এবং একমাত্র দায়িত্ব হলো ইভিএম পাহারা দেয়া। বুথের ভেতরে তৃণমূলের দুষ্কৃতদের ভোট লুট ঠেকানো তাদের কাজ নয়। বুথে বুথে গুন্ডামি আটকানোর জন্য তারা আসেননি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের মুখে এই মন্তব্য শোনার পরেও কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নির্বাচন দপ্তরের তরফ থেকে কোনো মন্তব্য শোনা যায়নি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই জওয়ানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, সামান্য নিন্দাসূচক মন্তব্যও শোনা যায়নি। এই দুয়ের যোগফলে সাহস আরো বাড়ে তৃণমূলের সমর্থকদের।
এই পরিস্থিতিতেই ভোটারদের সম্মিলিত প্রতিরোধ যথেষ্টই তাত্পর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভোটারদের একটা বড় অংশই এগিয়ে এসেছে ভোট-গুন্ডামির বিরুদ্ধে। এককাট্টা হয়ে পুরুষ ও মহিলারা দলবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রের দিকে এগিয়েছেন শাসকদলের পেশিশক্তির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই। তৃণমূলের দুষ্কৃতরা তাদের আটকানোর চেষ্টার কসুর করেনি। কিন্তু কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের উদ্যোগ ছাড়াই ভোটারদের দলবদ্ধ প্রতিরোধ অনেক জায়গাতেই তাদের রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে। এমনই দলবদ্ধ প্রতিরোধের ঘটনায় মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলায় প্রাণ হারাতে হয়েছে টিয়ারুল শেখ নামে এক স্থানীয় ভোটারকেও।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই প্রতিরোধী জনতা তৃণমূল বিরোধী তাতে কোনো সন্দেহই নেই। বাম, কংগ্রেস কিংবা বিজেপিপন্থি হতে পারেন এই ভোটাররা। ভোটারদের এই সম্মিলিত প্রতিরোধ এবারের ভোটের নতুনত্ব বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। তারা এমনটাও মনে করছেন, এই প্রতিরোধ কোথায় কতটা কাজ করলো, তার ওপরেই নির্ভর করবে ভোটের ফলাফল। যথেষ্ট সফল হলে ওলট-পালটও হয়ে যেতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অঙ্ক।
n লেখক: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক
