আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই জোটরাজনীতির প্রচলন আছে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এর রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস। ভোটের রাজনীতিতে জোটের রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা আছে বৈ কি।
তবে শুধু ভোটের হিসাব-নিকাশ বা এমপি-মন্ত্রিত্ব অর্জনের জন্য জোট হয়, তা সত্য নয়। অনেক সময় একটি রাজনৈতিক দলের শক্তির উত্স যেখানে, সেখানকার পরামর্শের ভিত্তিতেও জোট গঠন করা হয়। এমনকি এরূপ উপদেশ অগ্রাহ্য করার পরিণাম ভালো হয় না। নব্বই দশকে যে গণতান্ত্রিক অভূত্থান ঘটে, তাতে আওয়ামী লীগের অবদান তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল বলে অনেকে মনে করেন। এই কারণে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই দলটির বিজয় লাভ ও সরকার গঠনের ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে বামঘরানার কয়েকটি দল থেকে যে ১৩টি আসন দাবি করা হয়েছিল, তা মেনে না নেওয়ায় শেষপর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি বলে কথিত আছে। যে সব অঞ্চলে কোনো দল এককভাবে শক্তিশালী নয়, সেখানে জোটগতভাবে নির্বাচন করার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। রংপুর বিভাগে এখনো জাতীয় পার্টির প্রভাব বিদ্যমান। যে কারণে জোটরাজনীতিতে এই দলটি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ও প্লেয়ারের ভূমিকায় অবতীর্ণ। অনুরূপভাবে ভারতে কংগ্রেস ও বিজেপি কেউই এককভাবে সরকার গঠনে সক্ষম নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাব সর্বভারতের রাজনীতিতে না থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে জোটের রাজনীতিতে তার গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। ছোট ছোট দলগুলি বিভিন্ন প্রদেশে এতটাই শক্তিশালী যে ভারতের বড় দুটি দল তাদের অস্বীকার করতে পারে না।
বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন উভয় জোটে কিছুটা অস্থিরতা আছে। গত কয়েক দিনে ২০ দলীয় জোটে কয়েক দফায় ‘স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার ভূ-কম্পনের’ সৃষ্টি হয়েছে। এই জোট থেকে ইতোমধ্যে বের হয়ে গেছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজিপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। অনড় অবস্থান থেকে হঠাত্ ইউটার্ন নিয়ে জোটগতভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিএনপির একাংশের সংসদে যোগদানে ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এমনকি একই ইস্যুতে অবস্থান পরিস্কার করার জন্য ৮ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন ফ্রন্ট শরিক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। আর শপথ প্রশ্নে ড. কামাল হোসেনকে ছেড়ে ‘তৃণমূল গণফোরাম’ গঠনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে এই দলের একাংশ। ফলে ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট সংকটে আছে।
এদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বলছে, মহাজোট সরকার এখন একক আওয়ামী লীগের। তারা এও বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পদ্ধতিতে হওয়ার প্রবণতা কমে আসছে। ১৪ দলের শরিক কেউ কেউ সরকারের সমালোচনা করলেও তারা জোট থেকে বেরিয়ে গেছেন, এমন কোনো খবর আমরা পাইনি। ১৪ দলের শরীক দলগুলোর অনেক নেতা নবম ও দশম জাতীয় সংসদে মন্ত্রী হয়ে সরকারে কাজ করেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তাদের কেউই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। এই নিয়ে ক্ষোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়। তারপরও ১৪ দলের ঐক্য বজায় আছে। ১৪ দলের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ(ইনু)এর সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসনুল হক ইনু সমপ্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনো অসন্তোষ নেই। মন্ত্রী থাকার সময়ও সরকারের মন্দ কাজের সমালোচনা করেছি। এখনো করব।’ আরেক শরিক দল জাতীয় পার্টি-জেপির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘১৪ দলের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আমাদের এই ঐক্য থাকবে। কিন্তু সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা আমরা করছি’। আর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হক হানিফ বলেছেন, ১৪ দল নিয়মিত বৈঠক করছে। অর্থাত্ তিনি বলতে চাচ্ছেন ১৪ দলে তেমন একটা সমস্যা নেই।
বাংলাদেশে জোটরাজনীতির প্রবণতা নতুন নয়। ব্রিটিশ শাসনামলেই এতদঞ্চলে রাজনৈতিক জোট গঠনের সূত্রপাত হয়। এই সময় আন্দোলন সংগ্রামের জন্য যেমন জোট হয়, যথা-তিতুমীরের কৃষক বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন, সিপাহী বিপ্লব ও নীল বিদ্রোহ, তেমনি সরকার গঠনেও রাজনৈতিক জোট তৈরি হয়, যথা- প্রজা-লীগ জোট ও শ্যামা-হক জোট মন্ত্রিসভা। আবার হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও জোটরাজনীতিরি অনুশীলন হয়েছে এ সময়, যেমন- লক্ষ্মৌ চুক্তি, বেঙ্গল প্যাক্ট ইত্যাদি। পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট (১৯৫৪) অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে। আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে এনডিএফ(১৯৬২), কপ(১৯৬৫), পিডিএম(১৯৬৭), স্যাক(১৯৬৯) ও ড্যাক(১৯৬৯) জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ও আইয়ুব শাহির পতন হয়। মুক্তিযদ্ধের সময় গড়ে ওঠে মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি ও সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ।
স্বাধীনতা উত্তর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সরকার বিরোধী জোট। এ সময় গড়ে ওঠে সরকার সমর্থক ত্রিদলীয় গণঐক্যজোট যার সমপ্রসারিত রূপ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল। এরপর ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ কালপর্বে ক্ষমতার অনুকূলে থেকে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ও জাতীয় ফ্রন্ট। তবে এ সময় বিরোধী রাজনৈতিক জোটসমূহ যেমন-৮, ৭ ও ৫ দলীয় জোটের আন্দোলন ছিল ব্যাপক আলোচিত। এই আন্দোলনের মুখে শেষপর্যন্ত এরশাদ সরকারের পতন হয়। নব্বই পরবর্তী গণতান্ত্রিক যুগে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বড় দুটি রাজনৈতিক দল প্রধানত জোট বাঁধে কখনও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে, কখনও জাতীয় পার্টির সঙ্গে। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট যেমন- চারদলীয় জোট, ১৮ দলীয় জোট কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি ও বামপন্থীদের জোট যেমন মহাজোট যতটা না আদর্শগত, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জোট রাজনীতিতে বড় ধরনের মেরুকরণ ঘটে। প্রথমে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন সরকারবিরোধী একটি জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। এরপর বিএনপিসহ সরকারবিরোধী অন্যান্য দলগুলোকে একত্রে করে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। একসময় বি. চৌধুরী ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ করে গঠন করেন যুক্তফ্রন্ট ও শেষপর্যন্ত যুক্তফ্রন্ট আসন বন্টনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং এরশাদ ও বি চীেধুরীর জোটকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নির্বাচনে অংশ নেয়। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত ইসলামী ঐক্যজোট নামে একটি ৩৪ দলীয় মোর্চার সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টিও আলোচনার খোরাক তৈরি করে।
উল্লেখ্য, ১৪ দল গঠন করা হয়েছিল বিএনপি-জামায়াতকে দুর্বল করার জন্য এবং বর্তমানে তারা যথেষ্ট কোণঠাসা। উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়ায় এখন তারা নিজ নিজ দল গোছানোর দিকে মনোযোগী। ২০ দলের শরিকরা হতাশ এই কারণে যে তারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া ভারতীয় নির্বাচন শেষে ও ঈদের পর একটি নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এ কারণেও দুই জোটের শরিকরা এখন অনেকটা দোদুল্যমান। তবে সব মিলিয়ে জোটরাজনীতিকে আমাদের ইতিবাচক অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাথীর মোহাম্মদের মতে, উন্নয়নের জন্য জোট সরকার (Alliance Goverment) উত্তম পদ্ধতি। ইংল্যান্ড, গ্রিস, জাপান, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জোট রাজনীতির চর্চা ভালোমতই বিদ্যমান। জোট করেই আমাদের প্রতিবেশি দেশের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসু সিকি শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় ছিলেন। সুতরাং বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট নিয়ে যে হতাশা ব্যক্ত করা হচ্ছে তা সাময়িক। জোটের ভাঙনকে জোটরাজনীতির পুনঃমেরুকরণ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখাই শ্রেয়।
n লেখক :সাংবাদিক
