প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

আপডেট : ১৩ মে ২০১৯, ২১:৪৮

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। তাই এই দেশকে শুরু থেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘাঁটি বলা হতো। তবে এই প্রবাদবাক্য বর্তমানে বেমানান। কেননা বাংলাদেশ অনেক উন্নত হয়েছে। অতীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ে অনেক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হতো। কিন্তু বর্তমানে যার পরিমাণ  অনেক কমে গেছে। ২০১৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের কথাই বলি। যে ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দশ হাজার মানুষ মারা যায়। সে হিসেবে বাংলাদেশ দুর্যোগে প্রাণহানি কমাতে সক্ষম হয়েছে। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে ফণী নামক ঘূর্ণিঝড় ছোবল দিয়ে গেছে। বাংলাদেশের রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগর। প্রতিবছরই কমবেশি ঘূর্ণিঝড় সাগরে সৃষ্টি হয়ে তার তাণ্ডব দেখায়। সর্বশেষ ফণী তার তাণ্ডব দেখিয়ে গেছে। বিধাতার শুকরিয়া বাংলাদেশে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি! তবে যেটুকু ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটেছে তাও কিন্তু অবজ্ঞা করার মতো নয়। অনেক ফসল নষ্ট হয়েছে, কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে দেশে মোট ৫৩৬ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বাড়িঘর, বাঁধ, রাস্তা, ফসল, মাছ, বন ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। উপকূলীয় এলাকায় ৩৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যে ক্ষয়ক্ষতিকে পুরোপুরি কম বলা যায় না! ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে সারা দেশে মারা গেছে ১৮ জন। বেশ কয়েকজন মারা গেছেন গাছ চাপা পড়ে। আর অধিকাংশই বজ্রপাতে। বাংলাদেশে একটা বিষয় লক্ষণীয় তা হলো বজ্রপাত বৃদ্ধি। অনেকটা হুট করেই দেশে বজ্রপাত বৃদ্ধি পেয়েছে।

 বর্তমানে সারাদেশে তীব্র তাপদাহ চলছে। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি পেরিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণেই তাপমাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে। ঘন ঘন বজ্রপাতের এটি প্রধান কারণ। বাংলাদেশে দেখা যায় বেশিরভাগ হাওর অঞ্চলগুলোতে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে। মানুষ ও গবাদিপশুরা যার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বজ্রপাত প্রাকৃতিক একটি নিয়ম। যা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে। বজ্রপাত বন্ধ করার উপায় মানুষের হাতে নেই, তবে বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি কমানোর সুযোগ রয়েছে। দেশের সরকার ইতোমধ্যে সারা দেশে ১০ লাখ তালগাছ লাগিয়েছে। বিজ্ঞানীরা তথ্য দিয়েছেন- তালগাছ বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে বেশি। যে স্থানগুলোতে তালগাছের সংখ্যা বেশি সে জায়গাগুলোতে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা কম। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয় আমাদের সবাইকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজ নিজ বসতভিটায় বেশি করে তালগাছ লাগানো উচিত। বজ্রপাত থেকে বাঁচার আর একটি উপায় হলো বাসাবাড়ি কিংবা বিল্ডিং-এ বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড বসানো। এতে করে বজ্রপাত হলে বিদ্যুত্  সেই দণ্ডের মাধ্যমে মাটিতে মিশে যাবে। এছাড়া টাওয়ার নির্মাণ করেও বজ্রপাত থেকে বাঁচা সম্ভব। সরকার অবশ্য বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।  বাংলাদেশ এমনিতেই জনসংখ্যাবহুল দেশ। তার উপর আবার জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি দেশটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রেখেছে। যত দিন যাচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ঝুঁকি বাড়ছে। বাতাসে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে উষ্ণ বায়ুর ফলে নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে সাগরে। আর ক্রমে সে নিম্নচাপগুলো প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফণী ঘূর্ণিঝড় শেষ নয়। চলতি মাসেই আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত আনতে পারে বাংলাদেশে এমনটা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যে ঘূর্ণিঝড়ের নাম হবে বায়ু। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে দেশের উপকূলীয় অনেক এলাকা লবণাক্ত হয়ে গেছে। যে-সকল জমিতে বর্তমানে ফসল চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে জমির লবণাক্ততা বাড়তে থাকলে ফসলের জন্য চাষযোগ্য জমি হারাবে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে দেশের ৩৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এই ৩৬টি গ্রামের মানুষ চাষযোগ্য জমি পাবে কি না সন্দেহ রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে এমন জাতের ধান আবিষ্কার করেছেন যা লবণাক্ত জমিতেও চাষ করা সম্ভব। সরকারের উচিত লবণাক্ত এলাকার কৃষকদের সাহায্য করা। দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য হলো ভাত।  বাংলাদেশের খাদ্য উত্পাদন ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ২০১৮ সালে বার্ষিক এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি জানায়, শস্য ক্ষতির সবচেয়ে বড় হুমকি হলো ঘূর্ণিঝড়। বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছে যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে শস্য উত্পাদনে। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা  দেয় বাংলাদেশে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। লবণাক্ত হয় ঊর্বর ফসলি জমি। প্রতিবছর বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় কোটি কোটি টাকার ফসল। বিনষ্ট হয় শস্য। ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছি আমরা। মাত্র আট মাত্রার ভূমিকম্প হলে অর্ধেক বাংলাদেশ ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গতবছর দেখেছি অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দিয়েছিল। চলতি বছর জলাবদ্ধতা ও বন্যা আরো প্রকট হবে বলছেন বিজ্ঞানীরা। যার প্রধান কারণ হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। নদ-নদী, খালবিল,  ড্রেন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে পানি যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে স্থায়ী এক জলাবদ্ধতা গ্রাস করবে দেশের অধিকাংশ অঞ্চল। আমাদের সচেতনতা ও আগাম প্রস্তুতিই পারবে প্রাকৃতিক এইসব দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস, বন্যা, বজ্রপাত, ভূমিকম্পসহ যাবতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্ট হয়। মানুষ চাইলেও এইসব দুর্যোগের মোকাবিলা করতে পারবে না। তবে দুর্যোগপূর্ব, দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী বিভিন্ন পদক্ষেপ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি কমায়। সরকার সর্বদা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আশা করি দেশের বিত্তবানরাও দুর্যোগে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াবেন।

nলেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।