জীবন-জীবিকা নিয়েই শঙ্কা!

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৩, ২২:২১
ছেলেটির মা গুরুতর অসুস্থ। চিকিত্সা করাতে অনেক টাকা দরকার ছিল। কোথা থেকে আসবে এই টাকা? বন্ধুদের সঙ্গে, পরিচিতদের সঙ্গে আলাপ করে সে; উপায় পায় না। হঠাত্ এক ক্রিকেটার বন্ধুই বুদ্ধিটা দিল, কোনো ক্লাবের সঙ্গে কথা বলে দ্যাখ। হ্যাঁ, এই বুদ্ধিতেই কাজ হল। ছেলেটির বাজারদর নিয়ে সন্দেহ না থাকায় আগাম হিসেবে তাকে একটি ক্লাব আট লাখ টাকা দিয়ে দিল; এ মৌসুমের দলবদলের সময় সমন্বয় করা হবে এই টাকা। ভাবছেন, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল? এরপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকল! না। এখানে আসলে সমস্যার শুরু। দলবদল, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ অনিশ্চিত হওয়ায় এখন সেই ধারের টাকা আর অসুস্থ মাকে নিয়ে কূলহীন সমুদ্রে পড়ে গেছে ছেলেটি। কোথা থেকে এই টাকা শোধ হবে, কিভাবে মায়ের চিকিত্সা হবে; সে জানে না। এমনকি দলবদল হলেও যে লটারির দলবদল হওয়ার কথা, তাতে ওই পরিমাণ টাকা সে পাবে কি না, তাও জানে না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে জানে, ‘আমার ক্যারিয়ার, পরিবারের কী হবে; কিছুই এখন জানি না ভাই।’ এই গল্প আপনি এখন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ওপর নির্ভরশীল শতাধিক ক্রিকেটারের যে কারো গল্প বলে চালিয়ে দিতে পারেন। এমন নিদারুণ সব গল্প বুকে নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের দিকে তাকিয়ে আছেন দেশের ‘ভবিষ্যত্’ বলে কথিত এই ক্রিকেটাররা। এরা এখন ক্রিকেটের কথা, মাঠের কথা ভাবার সুযোগও পাচ্ছে না; ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের অনিশ্চয়তা তাদের জীবনের লড়াইয়ে নামিয়ে দিয়েছে! বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল নজির হিসেবে একটা মৌসুমের ঢাকা লিগ এবার সম্ভবত আর আলোর মুখ দেখতেই পারছে না। যদিও ক্লাবগুলো আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট বলছে, সেপ্টেম্বরে খেলা হতে পারে। যুক্তিতর্ক বলে, সেপ্টেম্বরে খেলা হলে পরের মৌসুমের খেলা নিয়েও ঘোরতর অনিশ্চয়তা হবে। পরপর দুটি লিগ কিছুতেই আয়োজন সম্ভব না। আর একটা লিগ কোনোক্রমে হলেও আগামী বছরটা বাংলাদেশ যেভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, বিপিএল, বাংলাদেশ লিগ, জাতীয় লিগ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে; তাতে আরেকটা লিগ নিয়ে তৈরি হবে সংশয়। আর এই সংশয় তৈরি করেছে প্রায় এক শ ক্রিকেটারের রীতিমতো জীবনজীবিকার সংশয়! হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন আর নাইন করুন—এটাই সত্যি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের শীর্ষ অন্ততশ’ দুয়েক খেলোয়াড়ের জীবন-জীবিকার চালক হয়ে আছে। হ্যাঁ, বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন যেমন বলেছেন, অনেক ক্রিকেটারের এর বাইরেও এখন আয়ের অনেক উত্স তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটা কতো জনের? সবমিলিয়ে ক্রিকেট বোর্ডের বেতনভুক্ত খেলোয়াড় আছেন ১২০ জন। বিপিএলে বিভিন্ন দল মিলিয়ে শ’ খানেক খেলোয়াড়। এই শ’ খানেক কিন্তু ওই চুক্তিভুক্ত খেলোয়াড়দের ভেতর থেকেই আসছে। বিপিএলের টাকা খেলোয়াড়রা কতোটা পাচ্ছেন, আমরা-আপনারা সবাই জানি। তার মানে, সোজা কথায় প্রিমিয়ার লিগের বাইরে জীবন বাঁচানোর মতো আয়ের উত্স আছে শ’ খানেক খেলোয়াড়ের। আর এর বাইরেই রয়ে গেছে আমাদের ক্রিকেটারদের মূল স্রোতটা। আরও ভয়ানক তথ্য হল, আলোর বাইরে থাকা এই ক্রিকেটারদের বড় অংশটাই হল তরুণ ক্রিকেটার; মানে আমরা যাদের ‘ক্রিকেটের ভবিষ্যত্’ বলতে পছন্দ করি। এই প্রিমিয়ার লিগটাকে এমন অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়ে আসলে তাহলে সেই ‘ক্রিকেটের ভবিষ্যত্’দেরই জীবন অনিশ্চিত করে দেয়া হচ্ছে না? এই প্রশ্নটা সেই তরুণ, আলোর বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের করার সাহস নেই। ক্ষুধায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও ভবিষ্যতের রুজির মালিক ক্লাব ও বোর্ডের বিপক্ষে মুখ খুলে আরও ঝুঁকি বাড়াতে চায় না কেউ। তারপরও জাতীয় দলের সাবেক তারকা তুষার ইমরান বলছিলেন এই ক্রিকেটারদের কথা, ‘আমরা যারা অন্যান্য কিছু আয় করি, বোর্ড থেকে বেতন পাই; তাদের হয়তো এরকম সংকট হবে না। কিন্তু এই ছেলেগুলো একদম বিরাট বিপাকে পড়ে যাবে। এর মধ্যে সম্ভাবনাময় কেউ কেউ যদি ক্রিকেট ছেড়েও দেয়, তাও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।’ হ্যাঁ, এমন ভয়াবহ ঘটনাও ঘটতে পারে। লিগের অনিশ্চয়তা এতোটাই দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে কিছু তরুণের; তারা এখন ক্যারিয়ার নিয়েও দুবার ভাবতে শুরু করেছেন। এই অনিশ্চয়তার দায় কে নেবে? আবহাওয়া, মাঠ, ব্যস্ত সূচি, ইনজুরি, ক্লাবগুলোর স্বার্থ, বিসিবির নিষ্ক্রিয়তা; হাজারটা কারণ আপনি খুঁজে বের করতে পারেন। তাতে লাভ হবে না। তাতে পেট ভরবে না এই ক্রিকেটারদের। এখন পেট ভরানোর উপায়টা কী, তাও বুঝতে পারছেন না ক্রিকেটাররা। এমনকি ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবও এই সময়ে এসে দ্বিধান্বিত ও নিয়তি নির্ভর কথাবার্তা বলছে। তারাও যেন বুঝে উঠতে পারছেন না কী করতে হবে। তারপরও কোয়াবের সভাপতি নাঈমুর রহমান দুর্জয় শেষ ভরসাটা রাখতে চান, ‘আমি বুঝতে পারি না, কী বলা উচিত। এই ২০১৩ সালে এসে লিগ আয়োজনের জন্য খেলোয়াড়দের বারবার রাস্তায় নামতে হবে, এটা তো খুব লজ্জার কথা। তবে আমি ভরসা রাখতে চাই। সভাপতি বলেছেন, ক্লাবগুলোও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে; আশা করি সেপ্টেম্বরে লিগ হবে।’ যদি না হয়? না হলে এই ছেলেগুলোকে কী উত্তর দেবেন দুর্জয়রা!