ইট-পাথরে ঘেরা এ নগরীতে সবুজের দেখা খুব একটা মেলে না। দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে খোলা জায়গা আর গাছপালা। পার্কগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধ। তবে এখনো নগরবাসীর দম নেওয়ার একটি জায়গা রয়েছে সেটি হচ্ছে রমনা পার্ক। এটাকে বলা হয় ‘রাজধানীর ফুসফুস’। প্রতিদিন মানুষ সকাল-বিকাল এখানে হাঁটাহাঁটি করতে আসেন। তবে নানা অব্যবস্থাপনায় পুরনো এ পার্কটি দিন দিন আকর্ষণ হারাচ্ছে। পার্কের ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, যেখানে-সেখানে খাবারের প্যাকেট, পলিথিন ব্যাগ পড়ে আছে। লেকের পানিতে ময়লা-আবর্জনা, গাছের ডালপালা পচে পানি কালো হয়ে গেছে। কমে গেছে পানির গভীরতা। আগাছায় ছেয়ে গেছে লেকের দুধার। অন্যদিকে শিশু কর্নারের রাইডগুলোও বেশ পুরনো। ফুটপাতের ইট ভেঙ্গে উঠে যাচ্ছে।
তবে সাত দশক বয়সী এ পার্কটি নতুন সাজে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পার্কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সৌন্দর্য বর্ধনের লক্ষ্যে দুই বছর মেয়াদী প্রকল্প নিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের পর দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ কাজের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, রমনার লেক পুনঃখনন করে এর দৈর্ঘ্য বাড়ানো ছাড়াও দর্শনার্থীদের বসার আধুনিক বেঞ্চ নির্মাণ, লেকের ওপর ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। লেকে সারা বছর পানি রাখার ব্যবস্থা করা হবে। পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং ল্যান্ড স্কেপিং বনায়ন করা হবে। উন্নত দেশের মতো লেক পাড়ে নির্মাণ করা হবে উডেন ডেক। চারপাশে সবুজের হাতছানি ও স্বচ্ছ জলের শোভা উপভোগ করা যাবে কাঠের ডেকে দাঁড়িয়ে। থাকবে পানির ফোয়ারা, লেক আইল্যান্ড। এছাড়া অত্যাধুনিক তিনটি গণশৌচাগার, ১১টি উন্মুক্ত কফি কর্নার, শিশু কর্নারে খেলার আধুনিক সরঞ্জাম ও রাইড বসানো হবে। পুরাতন ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার ফুটপাতের পরিবর্তে সিরামিক ইটের রাস্তা নির্মাণ করা হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাহাদাত হোসেন বলেন, সাধারণ মানুষের অবসরযাপনের মুক্ত জায়গা রমনা পার্ক নতুন সাজে সাজবে। পুরো কাজ শেষ হলে সত্যিকার অর্থেই রমনার নয়নাভিরাম দৃশ্যে মুগ্ধ হবেন দর্শনার্থীরা।
পার্কের ইতিকথাঃ মোগল আমল এবং ঢাকার নবাবদের নিসর্গ পরিকল্পনার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে রমনা পার্ক। ‘রমনা’ শব্দের অর্থ ইংরেজিতে ল’ন (Lawn)। তবে রমনা শব্দটি ফার্সি। রমনা শব্দের অর্থ ‘সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর’। এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ১৬১০ সালে মোগল সেনাপতি ইসলাম খান। তখন এর নাম ছিল বাগ-ই-বাদশাহি। পার্কের বর্তমান আয়তন ৬৮ দশমিক ৫ একর। এর লেকের আয়তন ৮ দশমিক ৭৬ একর। এটি বর্তমানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন রয়েছে। শুরুতে রমনার অবস্থান ছিল পুরনো হাইকোর্ট ভবন থেকে বর্তমান সড়ক ভবন পর্যন্ত। এটি মোগলদের তৈরি বাগান যেটা নির্মাণ করা হয়েছিল ১৬১০ সালে। ইংরেজ আমলে সেটাই ‘রমনা গ্রিন’ ও ‘রমনা পার্ক’ নামে পরিচত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে রমনা অযত্ন-অবহেলায় বিশাল জঙ্গলে পরিণত হয়। পরে উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসকরা ঢাকার নবাবদের সহায়তায় ঢাকা শহরের নিসর্গ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রমনা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯০৮ সালে লন্ডনের খ্যাতনামা কিউই গার্ডেনের কর্মী ক্রাইড লকের তত্ত্বাবধানে ‘রমনা পার্কে’র পুনর্গঠন কাজ শুরু হয়। পত্রপল্লবে শোভিত রমনা এ সময় ঢাকা শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
