জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮ সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিধিমালার ১৪(১ক) ধারা সংশোধন করে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ গ্রহণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যদি দলীয় প্রধান হন, তবে তিনি সব নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা চালাতে পারবেন। মন্ত্রীরা প্রার্থী হলে তার নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা চালাতে পারবেন। ইসি সচিবালয় থেকে কমিশনের কাছে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০১৩ প্রস্তাবনার খসড়ায় এসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, কমিশনের পরামর্শ অনুসারেই কমিশন সচিবালয় থেকে আমাদের কাছে এ প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। কমিশন বেঠকে এটি পর্যালোচনা করার পর অনুমোদন দেয়া হবে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে আগামী দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি শুরু হয়েছিল। সেই অনুযায়ী আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালার সংশোধনী আনা হচ্ছে।
খসড়া প্রস্তাবনা অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে প্রধানমন্ত্রীর সাথে অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন। তবে সব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নন। দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অনধিক ২০ জনকে মনোনয়ন দিতে হবে। আগের আচরণ বিধিমালায় বলা ছিল, সংসদ নির্বাচনে সরকারের কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমমর্যাদাসম্পন্ন সরকারি সুবিধাভোগী কোন ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
কিন্তু নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে রবিবার নির্বাচন কমিশনারদের কাছে নতুন আচরণ বিধিমালার যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে তাতে মন্ত্রীদের নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে বাধামুক্ত করে দেবার কথাই বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত আচরণ বিধিমালায় সরকারি সুবিধাভোগী কতিপয় ব্যক্তির নির্বাচনী প্রচারণা সংক্রান্ত বিধির একাংশে সরকারের কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমমর্যাদাসম্পন্ন সরকারি সুবিধাভোগী কোন ব্যক্তির সাথে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং সিটি করপোরেশনের মেয়রদেরও নির্বাচনী প্রচারণায় নিষিদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু অন্য অংশে বলা হয়েছে, দলীয় প্রধান এবং তাঁর মনোনীত অনধিক ২০ জন নেতা বা ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না। এসব ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হলেও ওই বিধান তাঁদের জন্য প্রয়োগ করা যাবে না।
এ প্রস্তাব সম্পর্কে নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, সংবিধান অনুসারে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই আচরণ বিধিতে এ পরিবর্তন আনার চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে। এটি না হলে বিরোধী দলের নেতারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারলেও সরকারি দলের অনেক নেতা তা পারবেন না। এছাড়া আচরণ বিধিতে ‘নির্বাচন পূর্ব সময়’-এর সংজ্ঞাতেও সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিদ্যমান আগের আচরণ বিধিতে ‘নির্বাচন পূর্ব সময়’ এর সংজ্ঞাতে বলা আছে, সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণ বা সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়। কিন্তু প্রস্তাবিত আচরণ বিধিতে এ সময় হচ্ছে সংসদের মেয়াদ অবসান বা সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে এর পূর্ববর্তী ৯০ দিন হতে সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত।
নির্বাচন কমিশনের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, সংবিধানে যে ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। সংবিধান অনুসারেই নির্বাচনী আইন ও আচরণ বিধি প্রস্তুত করতে হবে। একাজ সম্পন্ন করার জন্য বেশি সময়ও আমাদের হাতে নেই।
এদিকে প্রস্তাবিত আচরণ বিধিমালা অনুসারে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোন প্রার্থী রাজনৈতিক দল বা জোটের প্রার্থী হলে তিনি তাঁর জন্য বরাদ্দ প্রতীকের পাশাপাশি দলের বা জোটের প্রধানের ছবিও নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট ও হান্ডবিলে ব্যবহার করতে পারবেন। প্রার্থীদের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে প্রচারণার সুযোগ থাকবে। তবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ফেসবুক, টুইটারসহ যে কোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো যাবে না। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ও মিথ্যা তথ্য প্রচার এবং ভোটার, প্রার্থী ও ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখানো যাবে না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিলবোর্ডে প্রচারণা ও প্রতীক হিসেবে জীবন্ত প্রাণী ব্যবহার করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। এছাড়া ব্যানার ও ডিজিটাল ব্যানার ব্যবহারে শর্ত জুড়ে দেয়া হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে নির্দিষ্ট মাপের সাদা-কালো ব্যানার ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচনে ‘না’ ভোটের বিধান তুলে দেয়া হচ্ছে। আচরণ বিধি লংঘন করলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধানও সংযুক্ত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একজন নির্বাচন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি সিটি নির্বাচনে ফেসবুক ও মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর অপব্যবহার হওয়াতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ( সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ আচরণ বিধিমালার মাধ্যমে বিষয়টি প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে বলেন। এছাড়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে আচরণ বিধিমালায় কোন ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে দোয়া-আশীর্বাদ করার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
