জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ঘুরে এলাম জামদানির হাট

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৩, ১৮:৪৭
শৈশবে বাবা-মার কাছে ও স্কুলের পাঠ্যবইয়ে মোঘল আমলের ‘জামদানি শিল্প’ নিয়ে অনেক শুনেছি। সেই থেকে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ী কিভাবে তৈরি হয় সেটা দেখার জন্য মনের ভিতর আগ্রহ জন্মাতে থাকে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে সময় সুযোগ করে জামদানি পল্লীতে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করতে থাকি। অবশেষে জামদানি পল্লীতে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ চলে আসল। বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হল। গ্রীষ্মকালীন ছুটির মধ্যে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নিকট থেকে জামদানি পল্লীর তথ্য জেনে নিয়ে আমি আমার বিভাগের বন্ধুদের নিয়ে এক বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে পড়ি। যদিও ঐ দিনটি ছিল গ্রীষ্মের প্রখর রোদ। গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহের কষ্টের কথা চিন্তা না করে শিল্পের শহর নারায়ণগঞ্জ ভ্রমণের আনন্দে মেতে উঠি সবাই। তারপর ক্যাম্পাস থেকে গুলিস্থানগামী বাসে চড়লাম ও ঐ বাস থেকে নেমে সরাসরি নারায়ণগঞ্জের বাসে ঝটপট উঠে পড়লাম। নারায়ণগঞ্জগামী বাস ছাড়ার কিছু সময় পর আমরা বাসের মধ্যে আড্ডায় মশগুল হয়ে পড়ি। সায়দাবাদ আসার সাথে সাথে আমাদের নিত্যদিনের ‘জ্যাম’ নামের বন্ধু আমাদের সাথে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত যুক্ত হল। তারপর দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আমার বন্ধুর তথ্য অনুয়াযী নারায়ণগঞ্জের তারাবো পৌরসভায় এসে পৌঁছাই। রিক্সাযোগে তারাবো পৌরসভার নোওয়াপাড়া গ্রামে অর্থাত্ আমাদের গন্তব্যস্থল জামদানি পল্লীতে পৌঁছে যাই। শীতলক্ষ্যার তীরঘেঁষা নোওয়াপাড়া গ্রামটির পরিবেশ অপূর্ব ও মনোমুগ্ধকর । আর এই শীতলক্ষ্যার পাড়েই গড়ে উঠেছে জামদানি পল্লী। সেখানে গিয়ে সৌভাগ্যবশতঃ এক স্থানীয় তাঁতীর সাথে পরিচয় হয়ে যায়। তিনি আমাদেরকে জামদানি পল্লী ঘুরিয়ে দেখান। আমরা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে কীভাবে তাঁতীরা মসলিন সুতা দিয়ে জামদানি তৈরি করে তা পর্যবেক্ষণ করতে থাকি এবং তাঁতীদের কাজের ফাঁকে তাদের সাথে আলাপ হয়। আলাপচারিতার মাধ্যমে তাঁতীদের সুখ-দুঃখের কথা উঠে আসে। জানা যায়, স্বল্প মূল্যের একটা জামদানি তৈরিতে একজন তাঁতীর একমাস সময় লেগে যায়। এমনকি কোন কোন শাড়ী তৈরিতে চার থেকে পাঁচ মাস সময়ও প্রয়োজন হয়। তাঁতীরা অত্যন্ত ধৈর্য্য ও পরিশ্রমের সাথে এই কাজটি করে থাকেন। এক্ষেত্রে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই তাঁতীরা এই ঐতিহ্যবাহী জামদানির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমাদের সামনে তুলে ধরলেন । এছাড়াও তাঁতীরা আরও মনে করেন, যদি জামদানি তৈরিতে নতুন নতুন ডিজাইন প্রয়োগ করা যেতে পারে সেক্ষেত্রে নিজ দেশে ও বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে এর চাহিদা আরও বাড়বে। উন্নত দেশগুলোতে এর চাহিদা বাড়াতে পারলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্নরকম প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে জামদানিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যেতে পারে। আরও জানতে পারলাম নোওয়াপাড়া গ্রামে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার রাত ১২ টায় জামদানির হাট বসে ও শুক্রবার সকাল ৯ টায় শেষ হয়। জামদানির এই হাটটি সম্বন্ধে জানার পর এটা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ি এবং রাত ১২ টার মধ্যে রাতের খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন করে আমরা সেই হাটে উপস্থিত হই। জামদানির হাটে স্থানীয় তাঁতীরা তাদের তৈরি শাড়ী বিক্রি করতে আসে ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় শাড়ী ব্যবসায়ীরা সেই শাড়ী ক্রয় করতে এখানে ছুটে আসেন। এখান থেকে পাইকারী দামে জামদানি কিনে নিয়ে সেই শাড়ী বিভিন্ন শো-রুমে ক্রেতাদের কাছে চড়ামূল্যে বিক্রি করে থাকে। এভাবে সারারাত ক্রেতা-বিক্রেতার দর কষাকষির মাধ্যমে জামদানি বিক্রি হয়ে থাকে। জামদানি হাটটি আমরা সবাই মিলে অনেক উপভোগ করি এবং সেখানকার জামদানির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সাথে সারারাত কেনাবেচার পাশাপাশি জামদানি বিষয়ে আলাপচারিতা হয়।