তুরস্কের ইজমির প্রদেশের মাঝখানে আছে সেলকুক জেলা শহর। তুরস্কের অন্যান্য শহরের তুলনায় এ আধুনিক শহরেই ট্যুরিস্টদের বেফশ আগমন ঘটে। কারণ হল এ শহর থেকে ২ কিলোমিটার দূরে পুরনো এলাকা ‘ইফেসাস’ একটি দর্শনীয় স্থান। আর এখানেই প্রাচীন মন্দির ‘আর্টেমিসের মন্দির’, পাহাড়ের ওপর ঈসা বে মসজিদ, অটোমান এস্টেট, গ্রান্ড দুর্গ, ভার্জিন মেরির ভবন, আরো অনেক পুরনো ঐতিহাসিক ভবন রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান আকর্ষণ ‘আর্টেমিস মন্দির’। এর স্থাপত্য শিল্পের জন্য মানুষের এত আগ্রহ। এখন এখানে আছে শুধু ধ্বংসাবশেষ। দেখা যায় ভিত্তি প্রস্তর ও স্থাপত্যের অংশ বিশেষ। এটি প্রাচীন সপ্ত আশ্চর্যের একটি।
প্রাচীন যুগে গ্রিক ও রোমানরা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করতো। দেব-দেবীদের জন্য তৈরি করতো মন্দির। এরূপ একটি মন্দির ‘আর্টেমিস মন্দির’। ‘আর্টেমিস মন্দির’ গ্রিকদের হলেও রোমানরা এটিকে ‘ডায়না মন্দির’ বলে। গ্রিক পৌরণিক মতে আর্টেমিস ছিলেন গ্রিকদের দেবী। রোমানরা আবার তাকে বলতো ‘দেবী ডায়না’। দেবী ডায়না বা দেবী আর্টেমিস ছিলেন শিকারের দেবী। প্রাচীনকালে মানুষ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো বলে এ দেবীর গুরুত্ব ছিল বেশি। দেবী আর্টেমিস বা দেবী ডায়না ছিলেন কুমারী অ্যাপোলোর যমজ বোন। তিন রোমান দেবী ছিলেন কুমারী, তারা হলেন— ডায়না, মিনোর্ভা ও ভেস্তা। তারা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জীবনে বিয়ে করবেন না।
ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে গ্রিকরা এই আর্টেমিস মন্দির নির্মাণ করে। মন্দিরটি লম্বায় ৩৭৭ ফুট ও প্রস্থে ১৫১ ফুট। দেবীর মূর্তির ঘরের চারিদিকে দুই সারিতে ৩৬টি কলাম ছিল। যার উচ্চতা ছিল ৪০ ফুট। এটিই গ্রিকদের প্রথম মন্দির যেটি পুরোটা মার্কেল পাথর দিয়ে তৈরি। এর ছাদ তৈরি করা হয়েছিল নকশা করা কাঠ দিয়ে। এ মন্দিরটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল ১২০ বছর। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে এক ভয়াবহ বন্যায় মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন্দিরের অনেকাংশ বালু ও পলিমাটিতে চাপা পড়ে। পরে খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে এর পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু হয়। ক্রিটানের স্থপতি Chersiphson ও তার ছেলে Metagenes-এর অধীনে ডিজাইন ও নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। নির্মাণ কাজ শেষ হতে সময় লাগে ১০ বছর।
এ মন্দির নিয়ে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। যেকোন মূল্যে বিখ্যাত হওয়ার জন্য Herostratus নামে এক ব্যক্তি খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ অব্দে মন্দিরটিতে আগুন লাগয়ে দেয়। তিনি ভেবেছিলেন এ কাজটি করলে বিশ্বব্যাপী খবর হবে এবং তার নাম ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, বিচারে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং তার নাম প্রকাশে বা উচ্চারণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অমান্য করলে শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। এজন্য একটি কথা প্রচলিত ‘herostratic fame’।
গ্রিক ও রোমান ইতিহাস মতে Herostratus কর্তৃক মন্দিরটি ধ্বংসকালে আলেকজান্ডারের জন্ম হয়। পৌরাণিক কাহিনী মতে দেবী আর্টিমিস জানতো তার মন্দির রক্ষা করতে আলেকজান্ডার পৃথিবীতে আসছেন। আলেকজান্ডার এ মন্দিরটি তৈরির উদ্যোগ নিলে ইফেসাসের লোকেরা কৌশলে আপত্তি জানায়। পরে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হলে তারা নিজেরা মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করে। তবে এবার মন্দিরটি আয়তনে আগের চেয়ে বড় ছিল। লম্বায় ৪৫০ ও গ্রন্থে ২২৫ ফুট এবং উঁচু ৬০ ফুট করা হয়। কলাম ছিল ১২৭টি। কাজ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে। অনেক বছর ধরে নির্মাণ কাজ চলে।
আর্টেমিসের প্রধান মূর্তিটির ডিজাইন করেন Endoeus। আবার মন্দিরের অন্যান্য অবকাঠামো পরিকল্পনা করেন ভাস্কর Rhoeeus। দেয়ালে অনেক চিত্রকর্ম ছিল আর কলামগুলো ছিল সোনা-রূপায় মোড়ানো। তাছাড়া প্রতিটি দেয়ালে ছিল মণিমুক্তা ও হীরার মতো মূল্যবান জিনিস। প্রবেশ পথে ছিল দুটি ডায়নার মূর্তি। যা ছিল মার্বেল পাথরের তৈরি ও রত্ন খচিত। মন্দিরটি মার্বেল তৈরির কারণে অনেক দূর থেকে দেখা যায়। রাতে চাঁদের আলোতে চকচক করতো।
২৬৮ সালে পূর্ব জার্মানির গোথ (Goths) উপজাতি আক্রমণ করে এটি ধ্বংস করে দেয়। জাহাজে করে লুটপাট সামগ্রী নিয়ে তারা চলে যায়। এরপর পুনঃনির্মাণ বা মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, প্রাকৃতিক কারণে ৪০১ সালে মন্দিরটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়। তবে এ মন্দিরের কিছু পাথর অন্যত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা যায়। কিছু মূর্তি অন্যান্য মন্দিরের শোভা বর্ধনের কাজে লাগিয়েছে।
প্রায় ৬০ বছর খোঁজাখুঁজির পর ১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অনুসন্ধানী দলের উদ্যোগে এ মন্দির আবিষ্কৃত হয়। খননকার্য চলে ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত। পরে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ডেভিড জর্জ হগার্থের নেতৃত্বে ১৯০৪ থেকে ১৯০৬ সাল পর্যন্ত পুনরায় খননকার্য চলে। এ সময় খননকালে তিনি তিনটি মন্দির ভবন দেখতে পান। পরে ১৯৮৭-৮৮ সালে পুনঃখনন করা হলে প্রাপ্ত মন্দিরের অংশবিশেষ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায় ব্রোঞ্জ যুগে বা খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এটির অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এ মন্দিরের যাবতীয় তথ্য ও নমুনা ‘Ephesus Room’ এ প্রদর্শিত হচ্ছে।
মন্দিরের ভিত্তি খননকালে দেখা যায় নানা ধরনের জিনিসপত্র। তার মধ্যে আছে স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে তৈরি মুদ্রা। ধারণা করা হয় স্যাঁতসেঁতে মাটি ও ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাবার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এ মন্দিরটি এত আকর্ষণীয় ছিল যে দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীগণ, দর্শনার্থীরা দেখতে আসতো। আবার অনেকে দেবী আর্টেমিসকে শ্রদ্ধা জানাতো স্বর্ণসহ বিভিন্ন জিনিস অর্ঘ্য দিয়ে। ইফেসাসে এখনো দেবী ডায়না বা দেবী আর্টেমিসের স্মরণে খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা, নাটক ছাড়াও নানা উত্সবের আয়োজন করা হয়।
খনন করে মন্দিরের যতটুকু ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে তা দেখেই মানুষ বিস্মিত হয়েছে। সাথে ছিল মুগ্ধতাও। প্রাচীন মানুষের সৃষ্ট এসব স্থাপত্যের ওপর ভর করেই আধুনিক বিশ্ব।
