এখন রাত নয়টা।
আমাদের ছোট চাচা এসেছেন। তিনি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় চাকরি করেন। রংপুরে ওনার পোস্টিং। ছুটি পেলেই আমাদের বাসায় চলে আসেন। এমনিতে রাশ গম্ভীর মানুষ। তবে আমাদের খুউব ভালবাসেন আর আদর করেন। আমাদের বললেন, বুঝলি ভাত ছাড়া জীবনটা খালি হয়ে যেত।
আমরা বলি, কী রকম চাচু?
ভাত না থাকলে আমাদের আর রইলো কী? ভাত ছাড়া আমাদের জীবন অচল হয়ে যেত না? ধর একথালা ভাত। আমার বড় বোন মিনি বলে, ধরলাম।
চাচা আবার শুরু করেন, আর একবাটি ডালের সাথে এক দলা আলু ভর্তা। কী রকম কম্বিনেশন বল দেখি?
আমি বলি, চাচা তুমি ভাত খেতে পছন্দ করো বলেই তুমি একটু মোটা।
চাচা প্রতিবাদ জানান, পছন্দ করি তা ঠিক। কিন্তু আমি আর আগের মত খাই না। ডায়েট কন্ট্রোল করি।
এমন সময় মা রাতের খাবারের জন্য ডাকতে এলো। ছোট চাচা বলেন, নাহ আমি রাতে আর এখন খাই না।
মা বলে, আরে আসো একদিন খেলে কিছু হবে না। এখন আবার তোমার জন্য মাংস আর খিচুড়ি রেঁধেছি।
কিন্তু ছোট চাচা তার প্রতিজ্ঞতায় অনড়। তিনি সত্যিই মাংস খিচুড়ির উদাত্ত আহ্বান উপেক্ষা করে রাতে না খেয়ে রইলেন। আমরা খেয়ে দেয়ে একটু পড়াশোনা করে ঘুমাতে গেলাম। ছোট চাচা অনেক রাত অব্দি বই পড়েন।
সকালে একটা ছোটখাট হৈ চৈ এ ঘুম ভেঙ্গে গেল। জানা গেল, আমাদের স্কুলে টিফিনের জন্য যে সেমাই রেঁধে রাখা হয়েছিল ফ্রিজে, সেটা নাই। শুধু বাটি পড়ে আছে টেবিলে। বাবার অফিসের লাঞ্চের জন্য একটা পাউরুটি ছিল। সেটার অর্ধেক নাই। একটা ছোট বাটিতে নাকি অতিরিক্ত খিঁচুড়ি আর একটু মাংস রাখা ছিল। সেটাও হাওয়া! শুধু বাটি আছে। জিনিস নাই! রান্নাঘরের তাকে অর্ধেক বয়াম চানাচুর ছিল। এখন বয়াম আছে চানাচুর নাই।
বাবা বললেন, রাহাতকে জিজ্ঞেস করো, ওই-ই খেতে পারে।
মা বলেন, ছি ছি এসব আবার জিজ্ঞাসা করা যায় নাকি? খেলে খাক। বুয়াটাও নিয়ে যেতে পারে। না না বুয়াতো বিকালেই চলে গেছে। ততক্ষণে ছোট চাচাও উঠে গেছে। বাবা আবারও মাকে বলেন, আরে জিজ্ঞাসা করো। জিজ্ঞেস করলে ক্ষতি কী? এতোগুলো খাবার কে খেলো? রাহাততো শুনলাম ডায়েট কন্ট্রোল করছে।
মা এবার চা দিতে ছোট চাচার ঘরে গেল। আমরাও পিছু পিছু গেলাম। ছোট চাচা সকাল বেলায়ই ঘুম থেকে উঠে গম্ভীর হয়ে মোটা একটা বই পড়তে শুরু করেছে। মা চায়ের কাপটা খাটের সাইড টেবিলে রেখে খুব মোলায়েম স্বরে ছোট চাচাকে জিজ্ঞেস করে, ভাই কিছু মনে করো না, তুমি কি কাল রাতে ডায়েট কন্ট্রোল করেছ?
ছোট চাচা বলেন, হ্যাঁ।
মা বললো, ওঃ আচ্ছা থাক। মা চলে যেতে চায়।
ছোট চাচা জিজ্ঞাসা করেন, কেন কিছু বলতে চান?
মা আমতা আমতা করে, না মানে ফ্রিজের খিঁচুড়িটা পাচ্ছি না। তুমি কি খেয়েছো? খেলে অসুবিধা নাই।
ছোট চাচা তাড়াতাড়ি বলে, ওতো অল্প একটু ছিল। ওটা আমি খেয়ে ফেলেছি। সামান্য।
জ্বী সামান্য। মা এবার খানিকটা সাহস পায়। তারপর বলে, ভাই টেবিলের পাউরুটির অর্ধেক?
হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, টেবিলের পাউরুটির অর্ধেক। পড়তে পড়তে ক্ষুধা পেয়ে গেছিল ভাবলাম পাউরুটিটা শুধু শুধু পড়ে আছে। তাই.... ছোট চাচা জানান।
মা লজ্জিত স্বরে বলে, ঠিক আছে ভাই। সেমাইটা?
সেটাতো পাউরুটি দিয়ে খেয়েছি।
মা এবার অনেকটা মরিয়া হয়ে বলে, রান্নাঘরের চানাচুর?
চাচা জানান, ও চানাচুর? সেমাই দিয়ে পাউরুটি খাবার পর মুখটা মিষ্টি মিষ্টি লাগছিল- তাই কয়েক মুঠো চানাচুর বাধ্য হয়ে মুখে দিয়েছি। কেন, কোন অসুবিধা? ছোট চাচা জানতে চান।
মা বলেন, না না কোন অসুবিধা না। সব সুবিধা। ভাই সকালের নাস্তাটা দিব?
ছোট চাচা সম্মতি দেন, দিয়ে দিতে পারেন। রাতে সব এলোমেলো খাবারে পেটটা ভরেনি। ডায়েট কন্ট্রোল করেছিতো। ভাত খাইনি। এখন কেমন জানি নিজেকে অগোছালো লাগছে।
মা ছোট চাচার জন্য তাড়াতাড়ি নাস্তা আনতে ঘর থেকে চলে যায়। দেরি হলে হয়তো ঘরদোরও অগোছালো করে ফেলতে পারেন!
