বুয়েটে পরীক্ষা পিছায় কেন?

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২১:২০
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এ দেশের গর্ব। দেশে এবং বিদেশে এর সুনাম সর্বজনবিদিত। এখানকার সব কিছুই ভালো মন্দ শুধু ওই একটাই—পরীক্ষা পেছানো। পরীক্ষা পেছায়নি—এমন কোনো সেমিস্টার আমি আমার ছয় বছরে পাইনি। বললাম ছয় বছর (২০০৭-২০১২), অথচ স্নাতক শেষ করার জন্য বুয়েটে আমার থাকার কথা ছিল চার বছর। ২০১০ সালের ডিসেম্বরেই আমাদের ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের পাস করে বের হয়ে যাবার কথা ছিল। সেখানে ২০১২-এর এপ্রিলে আমরা পাস করে বের হয়েছি। প্রায় দেড় বছরের এই দীর্ঘ সেশন জটের অন্যতম প্রধান কারণ প্রতিটি পরীক্ষা এক বা একাধিকবার পেছানো। প্রশ্ন হলো, বুয়েটে পরীক্ষা পিছায় কেন? বুয়েটের একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে এ প্রশ্নের উত্তর আমার যা মনে হয়েছে তা হলো বুয়েটের শিক্ষার্থীদের খামখেয়ালিপনা এবং সেশন জটের ব্যাপারে উদাসীনতা। যদি তাই না হবে—তাহলে আমরা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার জন্য মারামারি করে ‘হল ভ্যাকেন্ট’ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতাম না। একটানা এক মাস ছুটি পাবার পরেও পরীক্ষা পিছাতে চাইতাম না। তবে এক্ষেত্রে সবাইকে দোষ দেওয়া যাবে না, অনেকেই আছে যারা সেশন জট চায় না। শিক্ষাজীবন প্রলম্বিত করার যে কী যন্ত্রণা তা আমরা বুয়েটের ছাত্ররা বুঝতে পারি শেষ বর্ষে এসে। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না। দেশের অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের স্নাতক সম্পন্ন হয়ে যায় অনেক আগেই। বুয়েটে ভর্তি হবার পর যেসব আত্মীয়স্বজন প্রশংসা করতেন, তখন তাঁরাই জিজ্ঞাসা করেন “এখনও বুয়েটে? ফেল করেছিলে নাকি?” বুয়েটের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ও যত্নবান। আটটি সেমিস্টারে আমরা এমন অনেক শিক্ষককে পেয়েছি যাঁরা পুরো টার্মের একটি ক্লাসেও অনুপস্থিত থাকেননি। আমরা শিক্ষার্থী হয়ে সকাল আটটার ক্লাসে যেতে আলসেমি করলেও স্যাররা ঠিকই যথাসময়ে ক্লাসে আসেন। কিন্তু পুরো টার্মের এই পরিশ্রম বিফলে যায় শুধুমাত্র পরীক্ষা পেছানোর জন্য। বছরে দুটি সেমিস্টার শেষ হওয়া তো দূরের কথা, কখনো কখনো একটি সেমিস্টার শেষ হতেই নয় মাস পার হয়ে যায়। বুয়েটে পরীক্ষা পেছানো অনেকটা একটি উত্সবের মতো হয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। দেশে আরো তিনটি পাবলিক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তারা ঠিকই যথাসময়ে কোর্স শেষ করতে পারছে, যা বুয়েট পারছে না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বুয়েটে যারা আসে, তারা শিক্ষাজীবনের অন্য সব স্তর যথাসময়ে পরীক্ষা দিয়ে পার করে আসে, তাহলে বুয়েটে এসে কেন ঠিক সময়ে পরীক্ষা দেয় না বা দিতে চায় না— এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে প্রচুর আলোচনা হওয়া দরকার। বুয়েটে পরীক্ষা পেছানোর যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের সময়ে ২০১০-এর ঈদুল আজহার পর নির্ধারিত দিনে ক্লাস শুরু করতে স্যাররা সক্ষম হননি,২০১১-এর ঈদুল আজহাতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে বুয়েটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে, ২০১০-এ একই অবস্থা। পরপর দুটো টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগের দিন রাতে পরীক্ষা পিছিয়েছে। বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি—এ বিষয়গুলো নিয়ে বুয়েট কর্তৃপক্ষের আরো গভীরভাবে ভাবা উচিত। শিক্ষার্থীদের খামখেয়ালিপনা, শিক্ষাজীবন প্রলম্বিত করার কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং শিক্ষকদের অতিরিক্ত সহনশীলতা বা প্রশ্রয় দান—এসবই বুয়েটে পরীক্ষা পেছানোর জন্য দায়ী বলে আমি মনে করি। সেইসঙ্গে আরো দায়ী ত্রুটিপূর্ণ একাডেমিক ক্যালেন্ডার। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা দেখেছি বুয়েটে ঈদুল আজহায় ঈদের দু’সপ্তাহ আগে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয় অথচ ঈদের তিনদিন পরই ক্লাস চালু করা হয়। এটাকে বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত বলা যায় না। চলতি সেমিস্টারের পরীক্ষা জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে চালু হবার কথা। একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে বুয়েটের বর্তমান অনুজ ছাত্রছাত্রীদের বলছি—এভাবে পরীক্ষা পিছিয়ে নিজেদের পায়ে কুড়াল আর মেরো না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা শিক্ষার্থীরাই, অন্য কেউ নয়। পরীক্ষা পেছানোর কোনো ভালো দিক নেই, এর পুরোটাই খারাপ দিক। নিজেদের মেধার প্রতি, যোগ্যতার প্রতি আর অবিচার করো না। আমাদের অতি প্রিয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেশন জট দূর হবে—এ প্রত্যাশা আমাদের সবার। নাটোর