ভোলার মনপুরা উপজেলায় গতকাল মঙ্গলবার পূর্ণিমার জোয়ারে ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। গত ২৫ জুন মনপুরা উপজেলায় ৪ নং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাতির খাল, সূর্যমুখীতে প্রায় ১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে পুরো ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে যায়। সেই থেকে আজ অবধি ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ মেরামতের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি পাউবো। সেই ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে ৪ নং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের ১ থেকে ৯ নং ওয়ার্ডের পূর্বপাশের সমস্ত গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। রমজানে পানিবন্দী মানুষের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মনপুরা উপজেলার ৪নং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নে বাতির খাল, সূর্যমুখীতে ১ কিলোমিটার ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে ১নং থেকে ৯নং ওয়ার্ডের পূর্বপাশের সমস্ত গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়। এতে প্রায় ঐ ইউনিয়নে ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। এদিকে ৩নং সাকুচিয়া ইউনিয়নের ১, ২, ৩নং ওয়ার্ড ও ২নং হাজিরহাট ইউনিয়নের ৫, ৬নং ওয়ার্ড, ১নং মনপুরা ইউনিয়নের ৬, ৭, ৮নং ওয়ার্ডে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ঐ সমস্ত এলাকায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। সর্বমোট মনপুরা উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-প্রকৌশলী আবুল কালামকে মোবাইল ফোনে বারবার ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।
বোরহানউদ্দিন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, পূর্ণিমার জো’র প্রভাবে ফুসে ওঠা মেঘনার জোয়ারের পানিতে ৪র্থ বারের মতো বোরহানউদ্দিনের দুই-তৃতীয়াংশ ভাসছে। স্বাভাবিকের চেয়ে ১৭ সে.মি. উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হওয়ায় প্রায় ৭ কি.মি. খোলা বেড়িবাঁধ দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার পৌর এলাকাসহ ৯ ইউনিয়নের মধ্যে ৭ ইউনিয়নই পানিতে তলিয়ে আছে। ফলে ঘর-বাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা পানিতে নিমজ্জিত। ঐ এলাকার মানুষ রান্না-বান্না করতে না পারায় সেহরী ও ইফতার করতে পারছেন না। চরম মানবেতের জীবনযাপন করছেন উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষ। এছাড়া হুমকির মধ্যে আছে শাহবাজপুর গ্যাস ফিল্ড।
মঙ্গলবার জোয়ারে উপজেলার বড়মানিকা, পক্ষিয়া, হাসাননগর, টবগী, কুতুবা, দেউলা, কাচিয়া ইউনিয়নসহ নদী থেকে ৫-৬ কি.মি. দূরবর্তী পৌর এলাকার ২, ৪ ও ৫ নাম্বার ওয়ার্ড পানিতে ডুবে যায়। বড়মানিকা, হাসাননগর ও পক্ষিয়া ইউনিয়নে চতুর্থ বারের মতো সম্পূর্ণ এলাকা পানিতে ডুবলো। ওই এলাকার শত শত মাছের ঘেরের মাছ চলে গেছে। ফসলী জমি দীর্ঘদিন পানিতে নিমজ্জিত থাকায় প্রায় ৩’শ একর জমির ফসল মাটির সাথে মিশে গেছে।
বড়মানিকা ইউপি’র বাটামারা গ্রামের মিজান, আঃ সাত্তার, ফিরোজ মিয়া, পক্ষিয়া ইউপি’র লামছিধলী গ্রামের শাহে আলম, নূরনবী, শেখ ফরিদ জানান, গত বছর বড়মানিকা এলাকা দিয়ে সাড়ে ৩ কি.মি. বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যায়। ঐ বাঁধ অদ্যাবধি নির্মাণ করা হয়নি। এছাড়া পক্ষিয়া অংশের বাঁধ পানির চাপে গত ১৫ দিন আগে ভেঙ্গে যায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৭ কি.মি. বেড়িবাঁধ বিহীন এলাকা দিয়ে হুহু করে পানি ঢুকে মুহূর্তেই বিশাল এলাকা তলিয়ে যায়। ওই এলাকার হাকিমুদ্দিন, নতুনবাজার, আলিমুদ্দিন, বাংলাবাজারসহ বোরহানউদ্দিন পৌর বাজারের মাছ ও তরকারি বাজার পানিতে ডুবে থাকায় বেচা-কেনাও বন্ধের পথে। তারা এ পরিস্থিতির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণ না করাকে দায়ী করছেন। মঙ্গলবার দেখা গেছে ভোলা পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউট এর চারদিক পানিতে থৈ থৈ করছে। ঐ সময় আশ্রয় নিতে আসা মোরশেদ, খোরশেদ, সাফিজল বাবুলসহ অনেক মহিলাকে পলিটেকনিকে আশ্রয় না পেয়ে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
বড়মানিকা ইউপি’র চেয়ারম্যান জহিরউদ্দিন বাবর, পক্ষিয়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবির, হাসাননগর ইউপি’র চেয়ারম্যান মানিক হাওলাদার সরকারের কাছে তাদের এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করে জরুরি সাহায্য দেয়ার আহবান জানান। উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহাঙ্গির হোসেন জানান, সার্বিক পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হান্নান জানান, জোয়ারের পানি সরে গেলেই বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা হচ্ছে। ভোলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার হাসান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, যে সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে জীবনহানির সম্ভাবনা থাকে এবং সরকারি নির্দেশ থাকে সেক্ষেত্রে শুধু আশ্রয় দেয়া যায়।
বরগুনা শহরসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
বরগুনা (উত্তর) প্রতিনিধি জানান, বুড়িশ্বর (পায়রা), বিষখালী ও খাকদোন নদীতে পানি বৃদ্ধি এবং রক্ষাবাঁধ না থাকায় বরগুনা শহরসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার শহরের নজরুল ইসলাম সড়ক, বাজার সড়ক, গোলাম সরোয়ার সড়ক, ডিকেপি সড়ক প্রায় এক থেকে দেড় ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। ফলে ঈদের কেনাকাটা করতে আসা নারী-পুরুষ ও শিশুদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বরগুনা পৌরসভার মেয়র মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, এ ব্যাপারে জরুরীভিত্তিতে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
